০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

কারবালা বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক

  • প্রকাশের সময় : ০১:২৭:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫
  • 159

 

ড. সাজ্জাদুল বারী

আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরার দিন। কারবালা শুধু ধর্মীয় শোকের ঘটনা নয়, এটি এক বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক। ঐতিহাসিকভাবে এটি এক নৈতিক আত্মত্যাগের নিদর্শন হলেও, বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কারবালা ছিল এক রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত, যেখানে শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভূরাজনীতি মিলেমিশে এক শোষণমূলক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

ইসলামের সূচনালগ্নে নেতৃত্ব নির্বাচিত হতো পরামর্শভিত্তিক প্রক্রিয়ায়, যেখানে সম্পদ বা বংশের প্রভাব ছিল না। খলিফা কিংবা নেতা নির্বাচনের যে নুন্যতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল, সেটাকে নষ্ট করে মুয়াবিয়া উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজতন্ত্র কায়েম করে পুত্র ইয়াজিদকে ক্ষমতায় বসান, যা সমাজে বৈষম্য ও শোষণ বৃদ্ধি করে। শুরু হয় ‘রাজার ছেলে রাজা হবে’-এর মতো অবজ্ঞামূলক এক ধারা।
রাষ্ট্রক্ষমতা উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরের যে ঐতিহ্য শুরু হয়, তা প্রজাদের মত ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব না দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়—যা একক আধিপত্যমূলক রাজনীতির সূচনা করে। ফলে, লক্ক্যবস্তুতে পরিণত হন যারা সেই ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করেন। ইসলামের সাম্যের জায়গায় আরব শ্রেষ্ঠত্ববাদের বীজ বপন শুরু হয়। ফলে, শোষণের প্রধান শিকার হন, শ্রমজীবী, কৃষক ও অনারব মাওয়ালিরা। ইমাম হোসাইন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং সমাজের প্রান্তিক জনগণও তার পক্ষ নিয়ে দাঁড়ান। কারবালায় ইয়াজিদের বাহিনী তাঁকে, তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের—এমনিক শিশুদের—নির্মমভাবে হ’ত্যা করে। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসে ন্যায়ের সংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে গিয়ে কারবালা হয়ে ওঠে একটি শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীক। ইমাম হোসাইনের নেতৃত্বে সংগ্রাম ছিল ধনিক উমাইয়া অভিজাতদের বিরুদ্ধে, যাঁরা সম্পদ ও ক্ষমতার একচেটিয়া দখলে রেখেছিল। তাঁর সঙ্গে ছিল প্রান্তিক জনগণ—মাওয়ালি, কৃষক, শ্রমজীবী শ্রেণি—যারা শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। অন্যদিকে ইয়াজিদের পক্ষ নিয়েছিল বিত্তশালীরা। দুনিয়াজুড়ে এমন বাস্তবতার ফলে কারবালাকে অনেকেই বিপ্লবী চেতনার প্রতীক অভিহিত করে বলেছেন—“প্রতিটি স্থানই কারবালা, প্রতিটি দিনই আশুরা”।

নারী নেতৃত্ব কারবালার প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। হযরত জয়নব (রা.), ইমাম হোসাইনের বোন, ইয়াজিদের দরবারে অকুতোভয়ে সত্য উচ্চারণ করে কারবালার বার্তাকে জীবন্ত রাখেন। একইভাবে হযরত আয়েশা (রা.)-ও তাঁর সময়ে পিতৃতন্ত্র ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এঁদের অবস্থান প্রতিরোধের ইতিহাসকে আরও পরিপূর্ণ করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কারবালা শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গেই নয়, প্রগতিশীল সাহিত্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। যেমন—ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মুনশি প্রেমচাঁদ, আলী সরদার জাফরি, মাখদুম মুহিউদ্দিন প্রমুখ লেখক-চিন্তাবিদ কারবালাকে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। আলী সরদার জাফরি কারবালার “আল-আতাশ (আমি তৃষ্ণার্ত!)” কান্নাকে সর্বজনীন দুঃখ ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে নিয়ে লেখা মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যে গদ্য মহাকাব্য হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ। উর্দু কবি শওকত আলী জওহর বলেন, “ক্বাতলে হোসাইন আসল যে মর্গে ইয়াজিদ হায় / ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালাকে বাদ” । নজরুলের ‘মহররম’ কবিতাও সেই মর্মগাথা থেকে লেখা।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যেও আমরা দেখি, মুয়াবিয়ার প্রবর্তিত রাজতান্ত্রিক কাঠামো কীভাবে বর্তমান শাসকদের মধ্যে টিকে আছে। ফিলিস্তিনে চলমান নিপীড়নের মুখেও অনেক আরব শাসকের নিরবতা—এই কাঠামোর ধারাবাহিকতাই প্রকাশ করে। তারা মানবিকতার চেয়ে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

এই কারণেই কারবালা কেবল একটি স্মরণ নয়—এটি বর্তমান বিশ্বের জন্য এক নৈতিক দিকনির্দেশনা। যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই, শাসকের জবাবদিহিতা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে হোসাইন হয়ে ওঠেন সব নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণা।

আশুরার মূল শিক্ষা—ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। সাময়িক আঘাত এলেও, চূড়ান্ত বিজয় ন্যায়েরই হয়। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়, “ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না।” তাই এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের লড়াই হতে হবে নীতিনিষ্ঠ ও আত্মোৎসর্গমূলক।

জনপ্রিয়

বগুড়ার শেরপুরে ৬০০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার, ড্রাইভার ও হেল্পার গ্রেফতার

কারবালা বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক

প্রকাশের সময় : ০১:২৭:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫

 

ড. সাজ্জাদুল বারী

আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরার দিন। কারবালা শুধু ধর্মীয় শোকের ঘটনা নয়, এটি এক বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক। ঐতিহাসিকভাবে এটি এক নৈতিক আত্মত্যাগের নিদর্শন হলেও, বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কারবালা ছিল এক রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত, যেখানে শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভূরাজনীতি মিলেমিশে এক শোষণমূলক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

ইসলামের সূচনালগ্নে নেতৃত্ব নির্বাচিত হতো পরামর্শভিত্তিক প্রক্রিয়ায়, যেখানে সম্পদ বা বংশের প্রভাব ছিল না। খলিফা কিংবা নেতা নির্বাচনের যে নুন্যতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল, সেটাকে নষ্ট করে মুয়াবিয়া উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজতন্ত্র কায়েম করে পুত্র ইয়াজিদকে ক্ষমতায় বসান, যা সমাজে বৈষম্য ও শোষণ বৃদ্ধি করে। শুরু হয় ‘রাজার ছেলে রাজা হবে’-এর মতো অবজ্ঞামূলক এক ধারা।
রাষ্ট্রক্ষমতা উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরের যে ঐতিহ্য শুরু হয়, তা প্রজাদের মত ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব না দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়—যা একক আধিপত্যমূলক রাজনীতির সূচনা করে। ফলে, লক্ক্যবস্তুতে পরিণত হন যারা সেই ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করেন। ইসলামের সাম্যের জায়গায় আরব শ্রেষ্ঠত্ববাদের বীজ বপন শুরু হয়। ফলে, শোষণের প্রধান শিকার হন, শ্রমজীবী, কৃষক ও অনারব মাওয়ালিরা। ইমাম হোসাইন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং সমাজের প্রান্তিক জনগণও তার পক্ষ নিয়ে দাঁড়ান। কারবালায় ইয়াজিদের বাহিনী তাঁকে, তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের—এমনিক শিশুদের—নির্মমভাবে হ’ত্যা করে। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসে ন্যায়ের সংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে গিয়ে কারবালা হয়ে ওঠে একটি শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীক। ইমাম হোসাইনের নেতৃত্বে সংগ্রাম ছিল ধনিক উমাইয়া অভিজাতদের বিরুদ্ধে, যাঁরা সম্পদ ও ক্ষমতার একচেটিয়া দখলে রেখেছিল। তাঁর সঙ্গে ছিল প্রান্তিক জনগণ—মাওয়ালি, কৃষক, শ্রমজীবী শ্রেণি—যারা শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। অন্যদিকে ইয়াজিদের পক্ষ নিয়েছিল বিত্তশালীরা। দুনিয়াজুড়ে এমন বাস্তবতার ফলে কারবালাকে অনেকেই বিপ্লবী চেতনার প্রতীক অভিহিত করে বলেছেন—“প্রতিটি স্থানই কারবালা, প্রতিটি দিনই আশুরা”।

নারী নেতৃত্ব কারবালার প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। হযরত জয়নব (রা.), ইমাম হোসাইনের বোন, ইয়াজিদের দরবারে অকুতোভয়ে সত্য উচ্চারণ করে কারবালার বার্তাকে জীবন্ত রাখেন। একইভাবে হযরত আয়েশা (রা.)-ও তাঁর সময়ে পিতৃতন্ত্র ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এঁদের অবস্থান প্রতিরোধের ইতিহাসকে আরও পরিপূর্ণ করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কারবালা শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গেই নয়, প্রগতিশীল সাহিত্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। যেমন—ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মুনশি প্রেমচাঁদ, আলী সরদার জাফরি, মাখদুম মুহিউদ্দিন প্রমুখ লেখক-চিন্তাবিদ কারবালাকে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। আলী সরদার জাফরি কারবালার “আল-আতাশ (আমি তৃষ্ণার্ত!)” কান্নাকে সর্বজনীন দুঃখ ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে নিয়ে লেখা মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যে গদ্য মহাকাব্য হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ। উর্দু কবি শওকত আলী জওহর বলেন, “ক্বাতলে হোসাইন আসল যে মর্গে ইয়াজিদ হায় / ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালাকে বাদ” । নজরুলের ‘মহররম’ কবিতাও সেই মর্মগাথা থেকে লেখা।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যেও আমরা দেখি, মুয়াবিয়ার প্রবর্তিত রাজতান্ত্রিক কাঠামো কীভাবে বর্তমান শাসকদের মধ্যে টিকে আছে। ফিলিস্তিনে চলমান নিপীড়নের মুখেও অনেক আরব শাসকের নিরবতা—এই কাঠামোর ধারাবাহিকতাই প্রকাশ করে। তারা মানবিকতার চেয়ে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

এই কারণেই কারবালা কেবল একটি স্মরণ নয়—এটি বর্তমান বিশ্বের জন্য এক নৈতিক দিকনির্দেশনা। যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই, শাসকের জবাবদিহিতা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে হোসাইন হয়ে ওঠেন সব নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণা।

আশুরার মূল শিক্ষা—ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। সাময়িক আঘাত এলেও, চূড়ান্ত বিজয় ন্যায়েরই হয়। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়, “ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না।” তাই এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের লড়াই হতে হবে নীতিনিষ্ঠ ও আত্মোৎসর্গমূলক।