বাগমারা থেকে মিজানুর রহমান মিজানঃ শনিবার, ১৬ জুন, ২০২৫
কমরেড ওহিদুর রহমান শনিবার (২৬ জুলাই ২০২৫), সকাল ৯টা নাগাদ ঢাকার ধানমন্ডিস্থ পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন!
কমরেড ওহিদুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনআলেখ্য:
ওহিদুর বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ওহিদুর রহমান নওগাঁ জেলার অন্তর্গত আত্রাই উপজেলার রসুলপুর গ্রামে ১৯৪৩ সালের ৯ই অক্টোবর শনিবার (১৩৫০ বঙ্গাব্দের ২৪শে আশ্বিন) জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতার নাম ইয়াদুন নেছা এবং পিতার নাম এবাদুর রহমান। সাত ভাই-বোন পরিবেষ্টিত একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পারিবারিক আবহে বেড়ে উঠা ওহিদুর রহমানের পিতা ছিলেন পেশায় একজন শিক্ষক; মাতা ছিলেন অতিসাধারণ একজন গৃহস্থ নারী।
স্থানীয় ভবানীপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৬১ সালে তিনি মেট্রিক পাস করেন এবং ১৯৬২ সালে তিনি নওগাঁ বি.এম.সি. কলেজে ইন্টারমিডিয়েড শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন এবং ১৯৬৭ সালে নওগাঁ ডিগ্রি কলেজ থেকে বি.এ. সমাপ্ত করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.এ. শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে এম.এ. শেষ করে ওহিদুর রহমান আত্রাইয়ের রসুলপুরে নিজ গ্রামে ফিরে যান। নিজ এলাকায় এসে তিনি পার্শ্ববর্তী ভবানীপুর গ্রামে অবস্থিত ভবানীপুর জি.এস. হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এ ভাবেই তার কর্মজীবনের সূচনা হয় এবং উক্ত স্কুলে তিনি প্রায় নয় মাস শিক্ষকতা করেন।
১৯৫৮ সালে সামরিক জান্তা আইয়ুব খান মার্শাল ল ঘোষণা করলে আত্রাইতে একটি মিলিটারি ক্যাম্প স্থাপিত হয়। সে সময় একজন মিলিটারি হাবিলদার স্থানীয় ভবানীপুর হাটে মুরগি কিনে দাম না দিয়ে বরং মুরগি বিক্রেতাকে শারিরীক নির্যাতন করলে ওহিদুর রহমান ও তার স্কুলের সহপাঠি ছাত্রগণ একটি মিছিল বের করে ঘটনাটির প্রতিবাদ জানান – এ সময় তিনি সর্বপ্রথম সম্মিলিত শক্তির জাদুকরী প্রভাবস্পর্শে স্নাত হয়েছিলেন।
১৯৬৭-৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন সহ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তিনি 'পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টি'র আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মতত্পরতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং প্রকাশ্যে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি – ন্যাপের (ভাসানী) সঙ্গে যুক্ত হন।
মওলানা ভাসানীর ডাকে সমগ্র পূর্ব বাংলায় ১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে কৃষকের অধিকার আদায়ের লড়াই ‘লালটুপি আন্দোলন’ দানা বেঁধে উঠলে ওহিদুর রহমান আত্রাইয়ে ‘কৃষক সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার খাস জমি ও ফসল দখল পূর্বক ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন প্রক্রিয়া শুরু করেন।
শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের পর আত্রাইয়ে ১১ সদস্য বিশিষ্ট সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি এ পরিষদের একজন সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে আরও সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিপ্রায়ে একটি পৃথক বাহিনী গঠনে মনোনিবেশ করেন, পরবর্তী সময়ে সমগ্র পূর্ব বাংলায় যা ‘ওহিদুর বাহিনী’ হিসাবে সম্যক পরিচিতি লাভ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ওহিদুর রহমানের পার্টি মহান মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ হিসাবে আখ্যায়িত করলেও তিনি নির্ভীক চিত্তে পার্টি থেকে ইস্তফা দেন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
ওহিদুর ও তার বাহিনী তদানীন্তন নওগাঁ-নাটোর-রাজশাহী মহকুমার ১৫টি থানা অঞ্চলে ছোট-বড় প্রায় শতাধিক যুদ্ধ তত্পরতায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি মিলিটারি ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করলে ওহিদুর ও তার বাহিনীর প্রায় সমস্ত গেরিলাগণ মুক্তিযুদ্ধকে একটি ‘অসম্পূর্ণ বিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে নবউদ্যমে মুক্তির দ্বিতীয় যুদ্ধে লিপ্ত হন [পাকিস্তানি উপনিবেশ উচ্ছেদের পর ইন্ডিয়ান উপনিবেশ উত্খাত করতে]। ১৯৭২ সালের মে মাসে ‘নকশাল আন্দোলন’-এ নেতৃত্বের অভিযোগে তিনি দু’পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার হন। ১৯৭৬ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পুনরায় পার্টি গঠনে মনোনিবেশ করেন।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট লীগ (মা-লে) নামের একটি ঐক্যবদ্ধ নতুন পার্টি গঠন করার প্রাক্কালে জিয়াউর রহমান কর্তৃক তার নবগঠিত পার্টিতে যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তত্ক্ষণাৎ তাকে বিনা অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। এক বছর পর ১৯৮০ সালে তিনি পুনরায় কারামুক্তি লাভ করেন।
চীন ও রাশিয়া ভ্রমণের নানামুখী বাস্তব উপলব্ধি থেকে পরবর্তী এ সময়ে ওহিদুর রহমান ‘সশস্ত্র বিপ্লব’-এর পরিবর্তে নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনীতিতে অধিক মনোযোগী ও আবিষ্ট হয়ে পড়েন। ১৯৮৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে গ্রামীণ জীবনের দরিদ্রতা ও অবক্ষয়ের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে সাংসদ নির্বাচিত হন এবং এ বছরেই সিপিবিতে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিপিবি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যৌথভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তিনি পুনরায় প্রার্থী নির্বাচিত হন। ইতোমধ্যে সিপিবি ও ১৪ দলীয় জোট উভয়ই ভেঙে গেলে তিনি এই ডামাডোলে দিশেহারা হয়ে এবং উপায়ান্ত না পেয়ে শেষে তত্কালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের অনুরোধ ও পরামর্শক্রমে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন। বর্তমানে তিনি যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মতত্পরতা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
ওহিদুর রহমান দৈনিক জনকন্ঠ সহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক পত্রিকা এবং সাময়িকীতে রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ ও ইতিহাস সংক্রান্ত নানাবিধ প্রসঙ্গে নিয়মিতভাবে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে থাকেন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওহিদুর রহমান তার বিগত দিনের কৃষক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও নকশাল আন্দোলনে অর্জিত অভিজ্ঞতার নির্মোহ বিবরণে রচনা করেছেন ‘মুক্তি সংগ্রামে আত্রাই’ নামক একটি গ্রন্থ।
ওহিদুর রহমান ১৯৭২ সালে তার একজন রাজনৈতিক সহকর্মীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার সহধর্মিনীর নাম ফেরদৌসী রহমান পারুল। ওমর ফারুক সুমন ও ওয়াহেদ মুরাদ সজল – ওহিদুর রহমান এবং ফেরদৌসী রহমানের দুই উত্তরপুরুষ। এছাড়াও নাদিরা নামক সন্তানের অধিক এক গৃহকর্মী আছেন, যিনি নিরলসভাবে আমৃত্যু তার দেখভাল করেছেন।
কমরেড ওহিদুর রহমান শনিবার (২৬ জুলাই ২০২৫), সকাল ৯টা নাগাদ ঢাকার ধানমন্ডিস্থ পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন!