জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের প্রায় সবগুলোই অযত্ন, অবহেলা আর তত্ত্বাবধানের অভাবে নিশ্চিহ্নের পথে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যেসব ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি নিদর্শন, মন্দির, মঠ কিংবা মসজিদ ছিল তার অর্ধেক সংখ্যক ইতোমধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাকিগুলোর ধধ্বংসাবশেষও বিলীনের পথে।
১৮০৭-১৮০৮ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞান গবেষক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন এবং ১৮৭৯-১৮৮৩ সালে স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার জরিপ পরিচালনা করেন। ফ্রান্সিস বুকাননের জরিপ কিছুটা সীমিত থাকলেও পরবর্তীতে স্যার আলকজান্ডার ক্যানিংহামের জরিপে আরও বেশ কিছু প্রত্নস্থল নতুন করে চিহ্নিত হয়।
এখানে একটি প্রশাসনিক অঞ্চলের নগর সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অন্ততপক্ষে এক ডজনেরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার নিদর্শন ছিল। এর মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ হলো বলিগ্রাম পুরাকীর্তি। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে এবং মাত্রাই বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে বলিগ্রাম মৌজায়। ইতিহাসবেত্তাগণ মনে করেন, পাল শাসনামলের রাজা রামপালের অধীন বলিধর রাজার এটি একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। বিখ্যাত পরিব্রাজক ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন এই জায়গাটি পরিদর্শন করেছিলেন। সে সময় ১৭টি ঢিবি বিদ্যমান ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে মাত্র ৪/৫টি ছোট্ট ঢিবি আজও তার প্রমাণ বহন করে। প্রায় ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ব্যক্তিমালিকানায় গিয়ে আজ মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে চাষের জমিতে পরিণত হয়ে গেছে। মূল স্থাপনার চারপাশে যে পরিখা ছিল সেটির এখনও চিহ্ন পাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে, বলিগ্রাম মৌজায় সাড়ে বাইশ গন্ধ্য অর্থাৎ ৯০টি পুকুর ছিল। কালাই উপজেলার অন্যান্য
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে পুনট ইউনিয়নের মোহাইল গ্রামের সুলতানি আমলের একটি মসজিদ ইতোমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। মোহাইল গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব কোনে একটি পুকুরের উত্তর-পশ্চিম পাড়ে চ্যাপ্টা আয়তাকার ইট, চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি এক লাইনে নামাজ পড়ার মতো এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। মোহাইল গ্রামের এই মসজিদ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে জগডুম্বর গ্রামের বুড়া পুকুর নামে একটি প্রাচীন পুকুরের পূর্ব পাড়ে পাশাপাশি মসজিদ এবং মন্দির ছিল, যা বর্তমানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একই ইউনিয়নের দেওগ্রামে দুটি মঠের অস্তিত্ব এখন বিলীন হয়ে গেছে। উদয়পুর ইউনিয়নের জামুড়া গ্রামে দুটি মন্দিরের ধাংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান রয়েছে।
মসজিদ, মন্দির ছাড়াও কালাই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে উঁচু ধাপগুলোর অধিকাংশই বিলীন। প্রকৃতপক্ষে এগুলো রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি ছিল। কালাই উপজেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হারুঞ্জা গ্রামে একটি উঁচু ধাপ ছিল। একটি পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে। এই উঁচু ঢিবিকে স্থানীয় জনগণ দ্বীপ বলে আখ্যায়িত করত। পুনট ইউনিয়নের ধাপ গ্রামের দ্বীপ মূলত একটি প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। স্থাপনাটি মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও এখানে ভবনের প্রশস্ত দেয়ালের চিহ্ন লক্ষ করা যায়। প্রায় দুই যুগ আগে এখানে পাকুড় গাছে আচ্ছাদিত একটি মঠ ছিল, যা বর্তমানে অস্তিত্ববিহীন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগুলো সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ নিলে রক্ষা পাবে এই অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য।