ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
রিফাত হোসেন মেশকাত, আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
শীত মৌসুম শুরু হতেই জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় জেঁকে বসেছে কনকনে ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশা। টানা কয়েক দিন সূর্যের দেখা না মেলায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কাকডাকা ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চারপাশ ঢেকে থাকছে কুয়াশার সাদা চাদরে। কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের প্রভাবে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপজেলার কৃষকরা।
উপজেলার পাশ্ববর্তী নওগাঁ জেলার বদলগাছী কৃষি আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। চলতি সপ্তাহজুড়ে উত্তরাঞ্চলে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ প্রায় ৯৯ শতাংশে অবস্থান করছে, যা ফসলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
লাভ-ক্ষতির দ্বিমুখী প্রভাব
এই স্যাঁতসেঁতে ও ঠান্ডা আবহাওয়া একদিকে কিছু শীতকালীন ফসলের জন্য সহায়ক হলেও অন্যদিকে অনেক অর্থকরী ফসলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে লাভ ও ক্ষতির এই দ্বিমুখী প্রভাবে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আক্কেলপুর উপজেলায় আলু চাষ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮শ হেক্টর জমিতে। এছাড়া টমেটো ১০ হেক্টর, সিম ১০ হেক্টর, বেগুন ৪০ হেক্টর, গাজর ১০ হেক্টরসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির চাষ ব্যাপকভাবে হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, হালকা কুয়াশা ও শীতল আবহাওয়া বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, মটরশুঁটি, পালং শাক, লাল শাক, মূলা ও গাজরের মতো শীতকালীন সবজির জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল। কুয়াশার কারণে জমিতে প্রাকৃতিক আর্দ্রতা বজায় থাকছে, ফলে সেচের প্রয়োজন কমছে এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ভালো হচ্ছে। অনেক কৃষকই এসব সবজিতে ভালো ফলনের আশা করছেন।
একইভাবে সরিষা ও গম চাষেও সীমিত পরিমাণ কুয়াশা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় গাছের বৃদ্ধি ও দানা গঠনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
অর্থকরী ফসলে বাড়ছে ঝুঁকি
তবে কুয়াশা যখন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, তখনই বিপত্তি দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো না পাওয়ায় ধানের বীজতলা, আলু, টমেটো, মরিচ, বেগুন ও পেঁয়াজের মতো অর্থকরী ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব ফসলে ছত্রাকজনিত রোগ, পাতাপচা, ডাউনি মিলডিউ, ব্লাইট ও লিফ কার্ল রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ইতোমধ্যে কিছু জমিতে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া ও ফল পচে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে।
কৃষকদের উদ্বেগ রুকিন্দীপুর ইউনিয়নের আওয়ালগাড়ী গ্রামের কৃষক জলিল মণ্ডল বলেন, "কুয়াশা না কাটলে জমি শুকাতে দেরি হয়। কয়েক দিন ধরে রাত-দিন সমানভাবে শিশির পড়ছে। জমিতে দীর্ঘ সময় ভেজাভাব থাকায় রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক দিয়েও তেমন সুফল মিলছে না।”
আক্কেলপুর পৌরসভার কৃষক আল রাফি জানান, এ বছর তিনি ৪ বিঘা জমিতে বোরো ধান লাগানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এজন্য ৬ কেজি বীজ ৯০০ টাকা দিয়ে কিনলেও অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে তার ধানের বীজতলার অর্ধেকের বেশি নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, "এই আবহাওয়া চলতে থাকলে সঠিক সময়ে ধান রোপণ করাই কঠিন হয়ে পড়বে।”
কৃষি বিভাগের পরামর্শ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইমরান হোসেন বলেন, "এই ধরনের আবহাওয়া বোরো ধানের বীজতলার জন্য ক্ষতিকর। তাই বীজতলা সাদা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আলুতে লেট ব্লাইট বা মোড়ক রোগের ঝুঁকি রয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করে সংক্রমণ দেখা দিলে অনুমোদিত মাত্রায় ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে।”
কৃষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ধান ও সবজি—উভয় ক্ষেত্রেই লাভের বদলে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়বে। তারা দ্রুত সরকারি সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে কৃষি পরামর্শ কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।