ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
এ.বি.এস রতন স্টাফ রিপোর্টারঃ ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
কৃষিপ্রধান জেলা নওগাঁ। যা উত্তরাঞ্চলের শস্যভান্ডার হিসেবেও পরিচিত। এ জেলার উৎপাদিত ধান, চাল ও নানা ফসলেই দেশের একটি বড় অংশের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। তবে নানা কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে সেই উর্বর ফসলি জমি। এর অন্যতম প্রধান কারণ অনুমোদনহীন অবৈধ ইটভাটা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে ওঠা এসব অবৈধ ইটভাটায় নিয়ম ভেঙে নির্বিচারে পোড়ানো হচ্ছে খড়ি। ফলে একদিকে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে, অন্যদিকে শত শত হেক্টর ফসলি জমি ধ্বংসের পথে। অভিযোগ দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকার মিলছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁর পোরশা উপজেলায় বর্তমানে ১১টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এর একটিও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তি সনদ (এনওসি) ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব ভাটার মধ্যে অন্তত ৮টিতে খড়ি ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হচ্ছে, যা আইন ও পরিবেশ বিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অবৈধ এসব ইটভাটা কৃষকদের লোভনীয় অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জমি লিজ নিচ্ছে। আবার অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই জমি লিজ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ।
নওগাঁ সদর উপজেলার বরুনকান্দি এলাকার দিঘা গ্রামের ভেতরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এম.বি.কে নামের একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে স্থানীয় শতাধিক বাসিন্দা বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে ইটভাটা বন্ধের দাবি জানানো হলেও আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ইটভাটার মালিক নির্বিঘ্নেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে এম.বি.কে ইটভাটার স্বত্বাধিকারী আব্দুল মান্নান দাবি করেন, আমরা আন্দোলন করার পর ডিসি অফিস থেকে এ বছরের জন্য মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যরা যেভাবে চালাচ্ছে, আমিও সেভাবেই শুরু করেছি।
পোরশা উপজেলার এক ইটভাটার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১১টি ভাটার মধ্যে মাত্র ৩টি কয়লা ব্যবহার করছে, বাকি ৮টি পুরোপুরি খড়ি পোড়াচ্ছে। আমরা ডিসি অফিসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম খড়ি ব্যবহার করব না। আমি নিজেও ভাটার মালিক হয়েও প্রশাসনের কাছে কিছু বলতে পারছি না।
পোরশা উপজেলায় ঢুকতেই সড়কের পাশে চোখে পড়ে কে.এম.এস ব্রিকস নামের একটি ইটভাটা। পুরো ফসলি মাঠজুড়ে ভাটার কার্যক্রম চলছে। ভাটার ম্যানেজার তারেক আজিজ জানান, প্রায় ৮ বছর ধরে এই ভাটার কার্যক্রম চলছে এবং বর্তমানে ৫৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবেশ ছাড়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব ধরনের রাজস্ব দেওয়া হয়। আর ইটভাটা চালাতে গেলে একটু খড়ি তো লাগেই।
এম.বি.কে ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, গ্রামের মধ্যে ইটভাটা কীভাবে সম্ভব? প্রশাসন একসময় বন্ধ রাখতে বলেছিল। ১৩৭ জন স্বাক্ষর দিয়ে অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব নাটকের কোনো মানে হয় না।
তাদের অভিযোগ, ইটভাটার কারণে রাতের বেলা ভারী যান চলাচলে ঘুম ভেঙে যায়, ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে এবং কৃষিজমি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
পোরশা উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আকবর আলী কালু ফোনে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম মিঠু বলেন, কোনোভাবেই খড়ি পোড়ানো যাবে না। এটি আমাদের প্রথম কমিটমেন্ট ছিল। কেউ করলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।
পোরশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকলেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। খড়ি পোড়ানোর বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চাইলে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা দেব।
নওগাঁ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমুল হোসাইন জানান, যেসব ইটভাটায় খড়ি পোড়ানো হচ্ছে, সেখানে আগের মতো এবারও অভিযান চালানো হবে। অভিযোগের সময় এম.বি.কে ইটভাটা বন্ধ ছিল। চালু থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, সরকারি নির্দেশনায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের ঘোষণা আসার পর গত এক মাসে জেলার ইটভাটা মালিকরা একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। তবে সে সময় জেলা প্রশাসন থেকে কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।