প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৩, ২০২৬, ৩:৪৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ৩০, ২০২৬, ২:২৮ পি.এম
শহিদ জিয়ার শাহাদতবার্ষিকীতে বিশেষ প্রতিবেদন
ছবিঃ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
গতানুগতিকতার বাইরে নতুন উদ্যমে জাগরণের ডাক
—এ্যাড. মোঃ শামছুল আলম
১. ভূমিকা: সময়ের দাবি ও নতুন পন্থার অন্বেষণ
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো কোনো আনুষ্ঠানিকতা কিংবা প্রথাগত শোক পালনের দিন নয়। বর্তমান বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই দিনটির তাৎপর্য অনেক গভীর ও বহুমাত্রিক। আজ সাধারণ মাপের আনুষ্ঠানিকতা, ব্যানার-ফেস্টুন আর চেনা স্লোগানের বৃত্ত থেকে বের হয়ে নেতাকর্মীদের হৃদয়ে নতুন করে 'জিয়াবাদ'-এর মূল চেতনাকে জাগ্রত করতে হবে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্বৈরাচারী চক্রান্তের বুলেটে আমরা আমাদের দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে হারিয়েছিলাম, সেই একই চক্রান্তের আধুনিক রূপ আজো সক্রিয়। এই আধুনিক ও বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হলে অতীতের গতানুগতিক ধারা ভেঙে নতুন পদ্ধতি, আধুনিক কৌশল ও যুগোপযোগী সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
২. শূন্য থেকে শিখরে: এক উজানের অভিযাত্রী
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কোনো আয়েসের রাজপথে হেঁটে কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রপ্রধান হননি। তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবন ছিল প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে এক চরম উজানের যাত্রা।
স্বাধীনতার ঘোষণা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে যখন দেশ এক চরম দিকভ্রান্ত, নেতৃত্বহীন এবং মহাসঙ্কটে নিমজ্জিত, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার বজ্রকণ্ঠের স্বাধীনতার ঘোষণা দিকভ্রান্ত জাতিকে দেখিয়েছিল মুক্তির আলো।
সম্মুখ সমর: তিনি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং প্রথম সারির 'জেড ফোর্স'-এর অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২. ক্রান্তিলগ্নে ত্রাতা: পরবর্তীতে দেশের এক চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রান্তিলগ্নে, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকলেও, ভঙ্গুর রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মূল ক্ষমতা ও দূরদর্শিতা ছিল জেনারেল জিয়ার হাতে। সেনাবাহিনীর ভেতরের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দূর করে এক সুশৃঙ্খল বাহিনী গঠন এবং ভেঙে পড়া বেসামরিক প্রশাসনকে পুনর্গঠন করা ছিল তাঁর এক অসাধারণ এবং ঐতিহাসিক কৃতিত্ব।
৩. মৃতপ্রায় অর্থনীতি ও পোশাক শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার পর পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত ভুল ও অব্যবস্থাপনায় দেশের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ ভঙ্গুর এবং মৃতপ্রায়। এই দুর্ভিক্ষপীড়িত ও তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ পাওয়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে জিয়াউর রহমান এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
গার্মেন্টস খাতের সূচনা: আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির যে মূল চালিকাশক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস—গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক শিল্প—তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাত ধরেই। তিনি প্রথম রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের দ্বার উন্মোচন করেন।
উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও কৃষি বিপ্লব: কলকারখানা স্থাপন ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তিনি দেশজুড়ে 'খাল খনন কর্মসূচি'র সূচনা করেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে কৃষিতে যে অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছিল, তার ফলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। তিনি ভিক্ষুক জাতির তকমা মুছে এক স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।
৪. বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চাইলে তৎকালীন সামরিক শাসনের সুযোগ নিয়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন খাঁটি গণতন্ত্রী।
"জিয়াউর রহমান সামরিক পোশাক খুলে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসেছিলেন এবং জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন।"
তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অবদানগুলো হলো:
বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার: বাকশালের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকে পুনরুজ্জীবনের সুযোগ দিয়ে তিনি দেশে 'বহুদলীয় গণতন্ত্র' ফিরিয়ে আনেন। আজকের দিনে যে দলগুলো রাজনীতি করছে, তাদের অনেকেরই পুনর্জন্ম হয়েছিল জিয়ার উদার গণতান্ত্রিক নীতির কারণে।
জনগণের ম্যান্ডেট: ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ম্যান্ডেট নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে এক অনন্য জনপ্রিয়তার ইতিহাস সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: ভূখণ্ডের সীমানা ও জাতিগত আত্মপরিচয়ের সংকট দূর করতে তিনি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন এক সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়—'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ', যা দেশের সব ধর্মের, বর্ণের ও গোষ্ঠীর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।
৫. সততা ও শৃঙ্খলার অনন্য প্রতীক
তৎকালীন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমের বিখ্যাত রিপোর্টারদের প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিয়ার শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ছিল অত্যন্ত কঠোর।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে তিনি নিজে যেমন অবিশ্বাস্য রকমের সাদামাটা জীবনযাপন করেছেন (যা তাঁর মৃত্যুর পর ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙা স্যুটকেসের সম্বল দেখে বিশ্ববাসী জেনেছিল), তেমনি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে এনেছিলেন। তাঁর এই সততা, দেশপ্রেম ও কঠোর পরিশ্রমের কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেন এবং জনমানুষের নেতা থেকে 'শহীদ জিয়া'-তে পরিণত হন।
৬. উপসংহার: নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান
১৯৮১ সালের ৩০ মে চক্রান্তকারীদের বুলেট তাঁর নশ্বর দেহকে স্তব্ধ করে দিলেও তাঁর আদর্শ, দর্শন এবং কর্মকে স্তব্ধ করতে পারেনি। আজকের দিনে বিএনপির এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান—কেবল কান্নাকাটি, শোক প্রকাশ কিংবা ঘরোয়া সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জিয়ার সেই গতিশীল, আধুনিক ও দূরদর্শী রাজনীতিকে নিজেদের মাঝে ধারণ করতে হবে।
তিনি যেভাবে পায়ে হেঁটে, হ্যারিকেন জ্বালিয়ে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন এবং মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন, ঠিক একইভাবে নেতাকর্মীদের আজ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জনই হোক রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে নেতাকর্মীদের নতুন উদ্যমে জেগে ওঠাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শহিদ জিয়ার অম্লান স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে, তাঁর দেখানো পথে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেওয়াই হোক এই শাহাদতবার্ষিকীর মূল অঙ্গীকার।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অমর হোন।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত