ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
এ.বি.এস. রতন, স্টাফ রিপোর্টারঃ ১১ জুলাই ২০২৬
নওগাঁ পৌর এলাকার আনন্দনগর বাগবাড়ি। চারদিকে সবুজের সমারোহ, আর সেই সবুজের বুকে ঝুলছে বিদেশি জাতের রঙিন আম ও বারি-৪ জাতের আমের দৃষ্টিনন্দন মুকুল-ফল। প্রায় ১০ বিঘা জমিজুড়ে বিস্তৃত এই বাগান যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব ক্যানভাস। কিন্তু এই বাগানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক আমগাছ নয়—এর নীরব অথচ নির্ভীক দুই প্রহরী, দেশি কুকুর ‘লালু’ ও ‘কালু’।
বাগানের মালিক কৃষক আব্দুল আলিম মানুষের চেয়ে বেশি আস্থা রেখেছেন এই দুই বিশ্বস্ত সঙ্গীর ওপর। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা তারা পাহারা দেয় পুরো বাগান। কর্মচারী থাকলেও নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব তাদেরই কাঁধে। ফলে আলাদা পাহারাদার রাখার প্রয়োজন পড়ে না।
শৈশবে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ছানা অবস্থায় লালু ও কালুকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন আলিম। সময়ের সঙ্গে তারা শুধু পোষা প্রাণীই নয়, পরিবারের অবিচ্ছেদ্য সদস্যে পরিণত হয়েছে। এক দুর্ঘটনায় লালু একটি পা হারালেও তার দায়িত্ববোধ বা সাহস এতটুকুও কমেনি। খুঁড়িয়ে হাঁটলেও বাগান রক্ষার প্রশ্নে সে আজও অপ্রতিরোধ্য।
পরিবারের সদস্যরা যা খান, লালু ও কালুর ভাগেও জোটে সেই একই খাবার। সুস্থ রাখতে নিয়মিত দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় টিকা, চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার। মাঝে-মধ্যে সেদ্ধ মাংসও দেওয়া হয়, যাতে তারা সুস্থ ও সবল থাকে।
বাগান মালিক আব্দুল আলিম বলেন, “শুধু বাগানের পাহারাদার নয়, লালু আর কালু আমাদের পরিবারের সদস্য। আমার মেয়েকে প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে বিকেলে তার খেলাধুলার সঙ্গী হওয়া—সবখানেই ওরা থাকে। অপরিচিত কেউ বাগানে ঢুকতে চাইলে আগে ওদের অনুমতি নিতে হয়। পরিবারের কাউকে চিনে নিলেই কেবল ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়।”
লালু-কালুর এমন বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ববোধ স্থানীয়দেরও মুগ্ধ করেছে। অনেকেই এই দুই প্রাণীকে বাগানের প্রকৃত অভিভাবক বলেই মনে করেন।
নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “একসময় কুকুর পালন ছিল মূলত শখের বিষয়। এখন গ্রামীণ নিরাপত্তা, কৃষি ও খামার রক্ষায় কুকুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করলে কুকুর মানুষের জন্য নিরাপদ এবং অত্যন্ত উপকারী প্রাণী।”
নওগাঁর এই আমবাগান যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা, যত্ন আর বিশ্বাস পেলে মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ক হয়ে উঠতে পারে অনন্য। লালু ও কালু শুধু দুটি কুকুর নয়; তারা বিশ্বস্ততার এক জীবন্ত প্রতীক, যারা নীরবে পাহারা দিচ্ছে স্বপ্ন, শ্রম আর একটি কৃষক পরিবারের ভালোবাসার ফসল।