ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
জাহিদুল ইসলাম (জাহিদ), স্টাফ রিপোর্টার: ১৬ আগস্ট ২০২৬
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতন-ভাতায় পাঠদান করে আসছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো সরকারি বেতন-ভাতা না পাওয়ায় আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানে রয়েছেন ১৮ জন শিক্ষক এবং ১০ জন কর্মচারী। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিপা জাহান বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে যাচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি—বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।”
আরেক সহকারী শিক্ষক রিমা বলেন, “প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, তারা সমাজের সম্পদ। এই শিশুদের গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু কোনো বেতন পাই না। অনেক সময় নিজের সংসারের প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে বিদ্যালয়ে আসি। আমরা চাই সরকার বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার ব্যবস্থা করুক।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের মা লাবিজা খাতুন বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী বাচ্চা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। ভ্যান ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসি, আবার নিয়ে যাই। লেখাপড়াও ঠিকমতো হয়। আমি চাই এই স্কুলের উন্নতি হোক, আমাদের বাচ্চাদেরও উন্নতি হোক।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নওফেল আলী বলেন, “প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের বোঝা নয়, তারা দেশের সম্পদ। এই সম্পদকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী নিয়মিত কাজ করছেন। শিক্ষকরা বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের যেমন উপকার হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশও আরও উন্নত হবে।”
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জামাল উদ্দিন বদির বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরবস্থা দেখে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যয় বহন করছেন। এমনকি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু রাখতে জমি বিক্রি করেও ব্যয় নির্বাহ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষক ও কর্মচারীরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমি নিজে যতটুকু পারছি বহন করছি। আমাদের স্কুলটির স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির জন্য সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ—বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।”
এদিকে বিদ্যালয়টি সরকারি কোনো অনুদানের আওতায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়।
কালাই উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সাদিকুর রহমান মণ্ডল বলেন, “নান্দাইল দিঘী অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল সম্পর্কে এইমাত্র আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আমি এখানে নতুন। স্কুলটি সরকারি অনুদানের আওতায় আছে কি না, তা আমার জানা নেই। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এবং সরকার এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিয়ে থাকলে, বিদ্যালয়ের যেসব বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন, তা করার চেষ্টা করব।”
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষক- কর্মচারীরা। তাদের প্রত্যাশা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত বিদ্যালয়টির স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির উদ্যোগ নেবে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশও আরও উন্নত হবে।