
ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
রিফাত হোসেন মেশকাত, আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
আধুনিকতার স্রোতে যখন গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার রায়কালীর গুডুম্বা, মাঝিপুকুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে নীরবে টিকে আছে এক ব্যতিক্রমী শিল্প—ঝুট কাপড় থেকে সুতা তোলার প্রাচীন কারিগরি।
এই গ্রামগুলোর অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন মাটির বাড়িগুলো যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা নান্দনিকতার জীবন্ত দলিল। দেয়ালে দেয়ালে নানা রঙের নকশায় সাজানো এসব বাড়ির অনেকগুলোই শতবর্ষী। একটি সাধারণ গ্রামেই এখনও অন্তত ২০ থেকে ২৫টি প্রাচীন মাটির বাড়ি প্রায় অবিকৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এসব বাড়ির উঠান কিংবা ঘরের ভেতর বসেই নারী-পুরুষ মিলিয়ে চলে ঝুট কাপড় থেকে সুতা তোলার কর্মযজ্ঞ।
স্থানীয় কারিগরদের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের সব মৌসুমেই এই কাজ চলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা কাজ করলে দিনে দেড় মন পর্যন্ত সুতা তোলা সম্ভব। লাল, নীল, সবুজসহ বাহারি রঙের এসব সুতা দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। যদিও এটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ, তবুও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেকেই এখন কাঠের তৈরি চরকি মেশিন ব্যবহার করছেন। ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা দামের এসব মেশিনে উৎপাদন ক্ষমতা যেমন বাড়ছে, তেমনি দৈনিক আয়ও কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সুতা গ্রামীণ শিল্পের পাশাপাশি শহরের গার্মেন্টস শিল্পেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
কারিগরদের দাবি, সুতার মান ও রঙ অনুযায়ী দাম নির্ধারিত হয়। উন্নতমানের সুতা কেজিপ্রতি প্রায় ৬০ টাকা এবং সাধারণ মানের সুতা কেজিপ্রতি ৬ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। ভালোভাবে কাজ করলে একজন কারিগর দিনে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার সমমূল্যের সুতা তুলতে পারেন। তবে পাইকারি বাজারে বিক্রির সময় ন্যায্যমূল্যের বড় একটি অংশ হারাতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।
৫৮ বছর বয়সী কারিগর বিলকিস বলেন, “ভালো মানের সুতা তুলতে পারলে আয় একটু বেশি হয়। কিন্তু বাজারে গেলে দাম কমিয়ে দেয়। আমাদের সময় আর শ্রম দুটোই বেশি লাগে।”
রায়কালির এই সুতা তোলা শুধু একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। বহু পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য টিকে আছে। পাশের বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার শাঁওইল গ্রামে এখানকার সুতা দিয়ে চাদর, কম্বল, শাল, মাফলার ও তোষকের কভার তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব সুতা দিয়ে দড়ি ও রশিও তৈরি করা হচ্ছে।
এই শিল্পকে ঘিরেই শাঁওইল হাটকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় হাজার দোকান। প্রতিদিন ঢাকা থেকে বাস ও ট্রাকযোগে অন্তত ১৫টি গাড়ি ঝুট কাপড় সেখানে আসে। আবার এখান থেকেই সুতা যাচ্ছে ঢাকা, নরসিংদীর বাবুরহাট, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, গাইবান্ধার কোচাশহর, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার সুতা। বর্তমানে ঝুট কাপড় থেকে প্রায় ৫০ ধরনের রঙিন সুতা উৎপাদিত হচ্ছে।
গাইবান্ধার কোচাশহর থেকে সুতা কিনতে আসা ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, “এখানকার সুতার মান খুব ভালো।” ঢাকার ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, “দাম তুলনামূলক কম আর মান ভালো হওয়ায় সারা বছর এখান থেকে কম্বল ও চাদর কিনে মজুত করি।”
এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কয়েকজন কারিগর এখন গ্রামের শিশুদেরও সুতা তোলার কাজ শেখাচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের এই শিল্প ধরে রাখতে পারে।
জয়পুরহাট বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, “ন্যায্যমূল্য ও সরাসরি বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও বিকশিত হবে। পাশাপাশি প্রাচীন মাটির বাড়িগুলো সংরক্ষণ করে সুতা তোলার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে। এতে গ্রামীণ পর্যটনও প্রসার লাভ করবে।”



























