
ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
এ.বি.এস রতন, স্টাফ রিপোর্টার: ১২ আগস্ট ২০২৬
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ প্রবাসী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। পরিবারের স্বপ্ন পূরণে প্রবাসের মাটিতে ঘাম ঝরানো এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধার দেশে ফেরার কথা ছিল জীবিত অবস্থায়। কিন্তু ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়ে এখন তাদের ফিরতে হবে কফিনবন্দী হয়ে।
রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় বলে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বজনরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী, উজানপৈ, ডুবাইসহ বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। যে পরিবারগুলো প্রবাসী স্বজনের পাঠানো অর্থে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, সেসব পরিবারে এখন শুধুই শোক আর অপেক্ষা।
নিহতদের মধ্যে একই গ্রামের চারজন রয়েছেন। তারা হলেন—আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।
এ ছাড়া সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮) নিহত হয়েছেন।
দুই সন্তান হারিয়ে নির্বাক মা
গন্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মোহন ও সুমনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দুই সন্তানকে হারিয়ে বারবার বিলাপ করছেন তাদের মা ময়না খাতুন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বড় ছেলে সাত বছর আগে এবং মেজো ছেলে দুই বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিল। তারা আর ছুটিতে বাড়ি আসতে পারেনি। মায়ের কাছে তারা বলেছিল, কষ্ট করে কাজ করে ঋণ শোধ করছে। বাড়ির কাজ শেষ করে দেশে ফিরে বিয়ে করারও স্বপ্ন ছিল।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দুই ছেলের জীবিত ফেরার অপেক্ষায় থাকা মায়ের ঘরে এখন ফিরবে তাদের নিথর দেহ।
নাতনির মুখ দেখার ১৪ দিনের মাথায় বাবাকে হারাল পরিবার একই গ্রামের নিহত রুবেল প্রামাণিকের বাড়িতেও চলছে আহাজারি। মাত্র ১৪ দিন আগে রুবেলের পরিবারে জন্ম নেয় একটি কন্যাশিশু। নবজাতকের মুখ দেখার আনন্দ কাটতে না কাটতেই পরিবারের ওপর নেমে এসেছে শোকের পাহাড়।
রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর জানান, প্রায় নয় বছর আগে সৌদি আরবে যান তাঁর ছেলে। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পর ছুটিতে দেশে ফিরে বিয়ে করেন। পরে আবার সৌদি আরবে চলে যান। কয়েক মাসের ছুটি শেষে মাত্র তিন মাস আগে তিনি কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছিলেন।
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে সাইদুর বলেন, তাঁর ছেলে সৌদি আরবে সোফা তৈরির কাজ করতেন। মাত্র ১৪ দিন আগে তাঁর নাতনি জন্ম নিয়েছে। মেয়ের মুখ দেখার আনন্দ শেষ হওয়ার আগেই ছেলেকে হারাতে হলো তাঁকে।
ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন, বের হওয়ার সুযোগ ছিল না—স্বজনদের অভিযোগ
ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার শ্রমিকরা ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁর দাবি, কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ফলে আগুন লাগার পর ঘুমন্ত শ্রমিকরা বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
তিনি বলেন, কারখানাটিতে শ্রমিকরা দিনের বেলায় ঘুমাতেন এবং রাতে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
হাসিবুল হাসান শুভ ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করার পর স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার থাকার পরে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি।
স্বজনদের অভিযোগ, পরিবারের ভবিষ্যৎ ভালো করার আশায় বিদেশে যাওয়া এই তরুণদের জীবনই শেষ পর্যন্ত থেমে গেল প্রবাসের কর্মস্থলে।
কফিনের অপেক্ষায় স্বজনরা
আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন নিহতদের স্বজনরা। তবে এ অপেক্ষায় নেই প্রিয়জনের দেশে ফেরার আনন্দ। বিমানবন্দরে ফুল দিয়ে বরণ করার পরিবর্তে স্বজনদের অপেক্ষা এখন কফিনবন্দী আপনজনের জন্য।
কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, আবার কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন। স্বজনদের আহাজারিতে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোর চোখেও পানি এসে যাচ্ছে। শোকের ভারে অনেক পরিবারেই যেন থমকে গেছে সময়।
মরদেহ ফেরাতে কাজ করছে সরকার
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে।
তিনি বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এদিকে ১৩ প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে শোকের আবহ বিরাজ করছে। পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় বিদেশে যাওয়া এসব মানুষের মৃত্যু শুধু তাদের পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের মধ্যেই গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
























