০৫:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সার-ওষুধের চড়া দাম ৷৷ ধানের দরে স্বস্তি নেই

  • প্রকাশের সময় : ০৫:২৩:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 26

ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ

ক্ষেতলালের আমন চাষিদের লাভের হিসাব মেলানো দায়

ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। বাতাসে দুলছে প্রায় ৪৫ দিনের লকলকে আমনধান। কোথাও আগাছা পরিষ্কার, কোথাও সার প্রয়োগ, আবার কোথাও মাজরা পোকার আক্রমণ ঠেকাতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন কৃষক। চোখজুড়ানো সবুজে ফলনের আশা জাগলেও উৎপাদন খরচের হিসাব কষতে গিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আমন চাষিদের।

সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা-মাড়াই ও পরিবহন—প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। বিপরীতে ধানের বাজারদর সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে ধান ঘরে তোলার পর প্রকৃতপক্ষে কতটা লাভ থাকবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষ করা কৃষকদের লাভের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলাল উপজেলায় ১০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবার আবাদ বেড়েছে ৫ হেক্টর। ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই আমনের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে জমিতে চলছে পরিচর্যার কাজ। কৃষকদের আশঙ্কা, ধান কাটা-মাড়াই পর্যন্ত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে।

সরকারি দামে সার, বাস্তবে বাড়তি খরচের অভিযোগ
কৃষি বিভাগের টাঙানো সরকারি মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ১৫ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি এমওপি ও ১ কেজি জিংক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে বেশি ফলনের আশায় কোনো কোনো কৃষক প্রায় ২০ কেজি পর্যন্ত ইউরিয়া ব্যবহার করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময়ে সরকারি নির্ধারিত দামে সবসময় সার পাওয়া যায় না। ফলে অনেক সময় ডিলার বা খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হয়। এতে বিঘাপ্রতি সার বাবদ তাদের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে কীটনাশকের খরচ।

বিঘাপ্রতি খরচ ১৪ হাজার টাকা ছাড়াচ্ছে
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমি প্রস্তুত করতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, চারা ও রোপণে ৫০০ টাকা, সার বাবদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, কীটনাশকে ১ হাজার টাকা, আগাছা পরিষ্কারে ১০০ টাকা, সেচে ১ হাজার ২০০ টাকা, ধান কাটায় ৪ হাজার টাকা, মাড়াইয়ে ৬০০ টাকা এবং পরিবহনে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

সব মিলিয়ে জমি পত্তনের খরচ বাদ দিয়ে এক বিঘা আমন চাষে কৃষকের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা। এই হিসাবের মধ্যে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য ধরা হয়নি।

পত্তন নেওয়া জমিতে লাভ আরও কম
নিজস্ব জমির কৃষকদের তুলনায় পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষিদের ব্যয় অনেক বেশি। কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন ফসলি জমি এক বছরের জন্য পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তিন ফসলের মধ্যে এক ফসলের আনুপাতিক পত্তন খরচ হিসাব করলে শুধু আমন মৌসুমেই বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার ৬৭০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়।

ফলে পত্তন খরচসহ এক বিঘা আমন চাষে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা।

১৭ মণ ধানেও লাভের নিশ্চয়তা নেই
কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে আমনের ফলন ১৭ মণ হলে এবং প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হলে ধান থেকে আয় হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। এর সঙ্গে খড় বিক্রি করে আরও ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পাওয়া গেলে মোট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা।

নিজস্ব জমিতে চাষের ক্ষেত্রে ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা খরচ হলে ধান ও খড় মিলিয়ে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত থাকতে পারে প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ থেকে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য এবং বাজারদরের ওঠানামা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, পত্তন খরচ যুক্ত হলে একই ফলন ও বাজারদরে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা। বিপরীতে সম্ভাব্য আয় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ পত্তন নেওয়া জমিতে সব খরচ বাদ দিয়ে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র প্রায় ৮০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। কৃষকের নিজের শ্রম, অতিরিক্ত পরিচর্যা, রোগবালাই, ফলন কমে যাওয়া কিংবা বাজারদর কমে গেলে এই সামান্য উদ্বৃত্তও লোকসানে পরিণত হতে পারে।

কৃষকের ভাষ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
ক্ষেতলালের আমন চাষি আইজুল বলেন, “ধানের ফলন ভালো দেখা গেলেও চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সার, ওষুধ, জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ আর ধান কাটার খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। ১৭ মণ ধান পেলেও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে হাতে খুব একটা লাভ থাকে না। নিজের জমি হলে কিছুটা সাশ্রয় হয়, কিন্তু পত্তন নেওয়া জমিতে লাভের সুযোগ আরও কম।”

আরেক কৃষক সোবাহান বলেন, “ধানের বর্তমান দাম একেবারে খারাপ না। কিন্তু সব খরচ হিসাব করলে লাভ খুবই কম। সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ধান কাটার সময় আরও খরচ হবে। শেষ পর্যন্ত ধান বিক্রি করে হাতে কত টাকা থাকবে, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।”

পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষ করা কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, “এক বছরের জন্য তিন ফসলি জমি পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগে। হিসাব করলে শুধু আমন ফসলের জন্যই প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার ৬০০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়। এরপর সার, ওষুধ, সেচ, পরিচর্যা, ধান কাটা-মাড়াই ও পরিবহনের খরচ রয়েছে। ধানের ভালো দাম না পেলে আমাদের মতো পত্তন নেওয়া কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন।”

ন্যায্যমূল্য ও সারের সুষ্ঠু সরবরাহ চান কৃষকেরা
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের সময়ে কৃষকের হাতে সঠিক দামে সার পৌঁছে দিতে ডিলার ও খুচরা বাজারে কঠোর নজরদারিরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, কৃষকেরা অনেক সময় মনে করেন, বেশি সার ব্যবহার করলে ফলনও বেশি হবে। কিন্তু অতিরিক্ত সার ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং সবসময় ফলন বাড়ে না। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অপ্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
সবুজে ভরা আমনখেত এখন কৃষকের চোখে সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগেরও প্রতিচ্ছবি। মাঠে ফলনের আশা থাকলেও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সেই আশাকে ম্লান করে দিচ্ছে। কৃষকদের এখন একটাই প্রত্যাশা—ধান ঘরে ওঠার মৌসুমে যেন তারা উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য পান। নইলে সবুজে ভরা আমনখেতের আড়ালেই থেকে যেতে পারে কৃষকের লোকসানের গল্প।

জনপ্রিয়

ক্ষেতলালে প্রেমিকের বাড়িতে এক সন্তানের জননীর অবস্থান ৷৷ বিয়ের দাবিতে আত্মহত্যার হুমকি

সার-ওষুধের চড়া দাম ৷৷ ধানের দরে স্বস্তি নেই

প্রকাশের সময় : ০৫:২৩:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ

ক্ষেতলালের আমন চাষিদের লাভের হিসাব মেলানো দায়

ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। বাতাসে দুলছে প্রায় ৪৫ দিনের লকলকে আমনধান। কোথাও আগাছা পরিষ্কার, কোথাও সার প্রয়োগ, আবার কোথাও মাজরা পোকার আক্রমণ ঠেকাতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন কৃষক। চোখজুড়ানো সবুজে ফলনের আশা জাগলেও উৎপাদন খরচের হিসাব কষতে গিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আমন চাষিদের।

সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা-মাড়াই ও পরিবহন—প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। বিপরীতে ধানের বাজারদর সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে ধান ঘরে তোলার পর প্রকৃতপক্ষে কতটা লাভ থাকবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষ করা কৃষকদের লাভের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলাল উপজেলায় ১০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবার আবাদ বেড়েছে ৫ হেক্টর। ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই আমনের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে জমিতে চলছে পরিচর্যার কাজ। কৃষকদের আশঙ্কা, ধান কাটা-মাড়াই পর্যন্ত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে।

সরকারি দামে সার, বাস্তবে বাড়তি খরচের অভিযোগ
কৃষি বিভাগের টাঙানো সরকারি মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ১৫ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি এমওপি ও ১ কেজি জিংক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে বেশি ফলনের আশায় কোনো কোনো কৃষক প্রায় ২০ কেজি পর্যন্ত ইউরিয়া ব্যবহার করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময়ে সরকারি নির্ধারিত দামে সবসময় সার পাওয়া যায় না। ফলে অনেক সময় ডিলার বা খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হয়। এতে বিঘাপ্রতি সার বাবদ তাদের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে কীটনাশকের খরচ।

বিঘাপ্রতি খরচ ১৪ হাজার টাকা ছাড়াচ্ছে
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমি প্রস্তুত করতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, চারা ও রোপণে ৫০০ টাকা, সার বাবদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, কীটনাশকে ১ হাজার টাকা, আগাছা পরিষ্কারে ১০০ টাকা, সেচে ১ হাজার ২০০ টাকা, ধান কাটায় ৪ হাজার টাকা, মাড়াইয়ে ৬০০ টাকা এবং পরিবহনে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

সব মিলিয়ে জমি পত্তনের খরচ বাদ দিয়ে এক বিঘা আমন চাষে কৃষকের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা। এই হিসাবের মধ্যে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য ধরা হয়নি।

পত্তন নেওয়া জমিতে লাভ আরও কম
নিজস্ব জমির কৃষকদের তুলনায় পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষিদের ব্যয় অনেক বেশি। কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন ফসলি জমি এক বছরের জন্য পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তিন ফসলের মধ্যে এক ফসলের আনুপাতিক পত্তন খরচ হিসাব করলে শুধু আমন মৌসুমেই বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার ৬৭০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়।

ফলে পত্তন খরচসহ এক বিঘা আমন চাষে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা।

১৭ মণ ধানেও লাভের নিশ্চয়তা নেই
কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে আমনের ফলন ১৭ মণ হলে এবং প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হলে ধান থেকে আয় হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। এর সঙ্গে খড় বিক্রি করে আরও ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পাওয়া গেলে মোট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা।

নিজস্ব জমিতে চাষের ক্ষেত্রে ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা খরচ হলে ধান ও খড় মিলিয়ে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত থাকতে পারে প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ থেকে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য এবং বাজারদরের ওঠানামা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, পত্তন খরচ যুক্ত হলে একই ফলন ও বাজারদরে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা। বিপরীতে সম্ভাব্য আয় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ পত্তন নেওয়া জমিতে সব খরচ বাদ দিয়ে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র প্রায় ৮০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। কৃষকের নিজের শ্রম, অতিরিক্ত পরিচর্যা, রোগবালাই, ফলন কমে যাওয়া কিংবা বাজারদর কমে গেলে এই সামান্য উদ্বৃত্তও লোকসানে পরিণত হতে পারে।

কৃষকের ভাষ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
ক্ষেতলালের আমন চাষি আইজুল বলেন, “ধানের ফলন ভালো দেখা গেলেও চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সার, ওষুধ, জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ আর ধান কাটার খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। ১৭ মণ ধান পেলেও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে হাতে খুব একটা লাভ থাকে না। নিজের জমি হলে কিছুটা সাশ্রয় হয়, কিন্তু পত্তন নেওয়া জমিতে লাভের সুযোগ আরও কম।”

আরেক কৃষক সোবাহান বলেন, “ধানের বর্তমান দাম একেবারে খারাপ না। কিন্তু সব খরচ হিসাব করলে লাভ খুবই কম। সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ধান কাটার সময় আরও খরচ হবে। শেষ পর্যন্ত ধান বিক্রি করে হাতে কত টাকা থাকবে, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।”

পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষ করা কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, “এক বছরের জন্য তিন ফসলি জমি পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগে। হিসাব করলে শুধু আমন ফসলের জন্যই প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার ৬০০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়। এরপর সার, ওষুধ, সেচ, পরিচর্যা, ধান কাটা-মাড়াই ও পরিবহনের খরচ রয়েছে। ধানের ভালো দাম না পেলে আমাদের মতো পত্তন নেওয়া কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন।”

ন্যায্যমূল্য ও সারের সুষ্ঠু সরবরাহ চান কৃষকেরা
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের সময়ে কৃষকের হাতে সঠিক দামে সার পৌঁছে দিতে ডিলার ও খুচরা বাজারে কঠোর নজরদারিরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, কৃষকেরা অনেক সময় মনে করেন, বেশি সার ব্যবহার করলে ফলনও বেশি হবে। কিন্তু অতিরিক্ত সার ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং সবসময় ফলন বাড়ে না। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অপ্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
সবুজে ভরা আমনখেত এখন কৃষকের চোখে সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগেরও প্রতিচ্ছবি। মাঠে ফলনের আশা থাকলেও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সেই আশাকে ম্লান করে দিচ্ছে। কৃষকদের এখন একটাই প্রত্যাশা—ধান ঘরে ওঠার মৌসুমে যেন তারা উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য পান। নইলে সবুজে ভরা আমনখেতের আড়ালেই থেকে যেতে পারে কৃষকের লোকসানের গল্প।