০৮:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

সীমান্তের আওয়াজঃ শিল্প-সাহিত্য পাতা

  • প্রকাশের সময় : ০৮:০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
  • 20

শুকনো নদীর প্রেক্ষাগৃহ

​শাহজাহান সরকার

​আজ বুধবার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার, পবিত্র ঈদুল আযহা। চারদিকে একটা উৎসবের মৃদু গুঞ্জন, মসলার ঝাঁঝালো গন্ধ আর কোরবানির পশুর ডাক। কিন্তু এই কোলাহল আব্দুল হাকিম সাহেবের জীর্ণ দেয়ালের ঘরে এসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় রূপ নেয়।

​আব্দুল হাকিম সাহেব একজন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ। সমাজে তাঁর একটা সুনাম আছে, সবাই তাঁকে একনামে চেনে। কিন্তু ভেতরের ফাঁপা কঙ্কালটা কেবল তিনিই চেনেন। এবার তিনি সন্তান, নাতি-পুতিদের জন্য একটা কোরবানির ব্যবস্থা করতে পারেন নাই। কোরবানি তো দূরের কথা, বাজার থেকে ৫-১০ কেজি মাংস কিনে এনে যে সবাইকে একটু তৃপ্তি করে খাওয়াবেন, সেই আর্থিক সামর্থ্যও অবশিষ্ট নেই। অথচ বাইরে তিনি এমন এক মুখোশ পরে ঘোরেন, যাতে কেউ বুঝতেই না পারে তাঁর এই চরম অভাবের কথা। কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে তাঁর মরে যাওয়া সহজ। ভিক্ষা করা কিংবা মিসকিনের মতো কারো দ্বারে গিয়ে দাঁড়ানো—তাঁর রক্তে নেই।

বাজারে শেষ মুহূর্তের কোলাহল। গরুর হাটের ধুলোমাখা মানুষগুলো বাড়ি ফিরছে। কারো হাতে রশি, কারো হাতে বাজারের ব্যাগ, কারো মুখে তৃপ্তির হাসি।

শুধু আব্দুল হাকিমের ঘরে কোনো শব্দ নেই।
একটা পুরোনো টেবিল ফ্যান কাঁপতে কাঁপতে ঘুরছে। মাঝেমধ্যে কটকট শব্দ করছে। হাকিম মিয়া মেঝেতে বসে আছেন। সামনে আধা কেজি ডাল, কিছু আলু, আর ছোট্ট একটা তেলের বোতল। পাঁচ হাজার টাকা শেষ।

টাকাটা বড় নাতনির বাবা পাঠিয়েছিল প্রাইভেট মাস্টারের বেতন দেওয়ার জন্য। বিকাশে টাকা আসার সময় জামাই বলেছি—

—“আব্বা, টাকাটা কালকের মধ্যে দিয়ে দিয়েন। মেয়েটার স্যার বারবার তাগাদা দিচ্ছে।”

হাকিম মিয়া তখন শুধু বলেছিলেন—
—আচ্ছা বাবা।

তারপর?
তারপর বাজার।
চাল নেই।
ডাল নেই।
ছোট নাতিটা দুইদিন ধরে ডিম খেতে চায়।
বড় মেয়ে ফোন করে বলেছে, “আব্বা, ঈদে একটু মাংসের ব্যবস্থা কইরেন।”

কোথা থেকে করবে?

তিনি বাজারে গিয়েছিলেন শুধু এক কেজি চাল কিনতে। কিন্তু বাজারে ঢুকেই বুঝলেন—এক কেজি চালে ঈদ হয় না। তারপর একটার পর একটা জিনিস কিনতে কিনতে পাঁচ হাজার টাকা শেষ হয়ে গেল।

এখন বুকের ভেতর শুধু আগুন।

তিনি জীবনে কারো কাছে হাত পাতেননি।
এলাকায় সম্মান আছে।

মানুষ তাকে “হাকিম ভাই” বলে ডাকে।
মসজিদে গেলে সামনে বসায়।
কেউ জানে না—ঈদের আগের রাতে তার ঘরে কোরবানির এক টুকরো মাংসও নেই।
তিনি কাউকে বুঝতেও দেন না।

কারণ অভাব লুকানোও এক ধরনের ইবাদত—এ কথা তিনি ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছেন।

কিন্তু আজ বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে।
তিনি বারবার ভাবছেন—
“বাবা হয়ে সন্তানদের ঈদে এক টুকরো মাংস দিতে পারলাম না!”

রাত তখন ১১টা।
ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু তিনি জেগে আছেন। বাইরে দূরে কোথাও মাইকে বাজছে—
“তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে…”
গানটা শুনতে শুনতে কখন যেন তার চোখ লেগে গেল।

তিনি দেখলেন—
তিনি আর তার এক পুরোনো বন্ধু সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন।
কোন সিনেমা?
মনে করতে পারছেন না।
শুধু মনে হচ্ছে, জীবনে দ্বিতীয়বার এই ছবি দেখতে এসেছেন। যেন আগে কোথাও দেখেছেন। যেন এই গল্প আগেও ঘটেছে।
রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন দু’জনে।

হঠাৎ তার বন্ধু আরেক বন্ধুকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল।
—“তুই আগে যা, দুইটা টিকিট কাইটা রাখ।”
হাকিম মিয়া মাথা নেড়ে সামনে এগোলেন।
অদ্ভুত একটা রাস্তা।
রাস্তার নিচে নদী। কিন্তু নদীতে পানি নেই। শুকনো। ফেটে যাওয়া মাটি। যেন বহুদিন কোনো স্রোত আসে না এখানে। তিনি নদীর মাঝখান দিয়ে হাঁটছেন।

চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ নদী থেকে ওপরে উঠতেই দেখলেন সামনে একটা কবরস্থান।

সারি সারি কবর।
বাতাস ঠান্ডা।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
তিনি ভাবলেন—
সিনেমা হলের সামনে কবরস্থান কেন?
তারপরও হাঁটলেন।

কারণ টিকিট কাটতেই হবে।
সিনেমা শুরু হয়ে যাবে।
টিকিট মাস্টারকে প্রথমে যেখানে দেখেছিলেন, সেখানে নেই। অন্য জায়গায় গিয়ে বসেছে।

তিনি গিয়ে বললেন—
—“দুইটা প্রথম শ্রেণীর টিকিট দেন।”
লোকটা তার দিকে তাকালও না।
অন্য লোকের সঙ্গে ব্যস্ত।
তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার মনে হলো—এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের কথার কোনো দাম নেই।
তিনি বিরক্ত হয়ে আরেকজন পরিচিত বাক্সওয়ালার কাছে গেলেন। গিয়ে দেখেন—লোকটা নেই। টিকিট বিক্রি বন্ধ করে চলে গেছে।

চারপাশে অদ্ভুত ভিড়।
অনেক মানুষ।
কিন্তু সবাই কেমন ফাঁপা।
খালি খালি।
যেন কারো ভেতরে প্রাণ নেই।

তিনি আবার প্রথম লোকটার কাছে ফিরে এলেন।
পকেট থেকে ২০ টাকার দুইটা নোট বের করলেন।
লোকটা এবার টাকা নিল।
দুইটা টিকিট দিল।
টিকিট হাতে নিয়ে হাকিম মিয়ার বুক ধক করে উঠল।
যদি বন্ধুকে আর না পান?
যদি ভিতরে ঢুকে আলাদা হয়ে যান?
যদি রাতে ফেরার সময় দেখা না হয়?
চারদিকে তখন সিনেমা হলের ভেতর থেকে শব্দ আসছে।
মনে হচ্ছে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে।
তিনি ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবেন—
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল।
রাত ১টা ২০।
হাকিম মিয়া উঠে বসে রইলেন।
ঘামছে শরীর।
চারপাশ অন্ধকার।
তিনি কিছুক্ষণ বুঝতেই পারলেন না—কোনটা স্বপ্ন, কোনটা বাস্তব।
তারপর ধীরে ধীরে মনে পড়ল—
ঈদ।
মাংস নেই।
টাকা নেই।
প্রাইভেট মাস্টারের বেতন নেই।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ছোট নাতিটার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“নানা…”
তিনি চমকে উঠলেন।
—“কি বাবা?”
—“কাল কি ঈদ?”
—“হ।”
—“আমরা মাংস খামু?”
প্রশ্নটা শুনে তার বুকের ভেতর কেউ যেন ছুরি চালিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন,
—“আল্লাহ বড় রহমতের মালিক বাবা…”
নাতিটা আবার ঘুমিয়ে গেল।
কিন্তু হাকিম মিয়া আর ঘুমাতে পারলেন না।
ফজরের আজান পর্যন্ত তিনি চুপচাপ বসে রইলেন।
তারপর অজু করলেন।
নামাজ শেষে দুই হাত তুলে শুধু একটা কথাই বললেন—
—“হে আল্লাহ, মানুষরে না পারি বলতে… তোমারে তো পারি…”

জনপ্রিয়

নওগাঁর সাপাহারে জমে উঠছে আমের বাজার, অপেক্ষা আম্রপালির

সীমান্তের আওয়াজঃ শিল্প-সাহিত্য পাতা

প্রকাশের সময় : ০৮:০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

শুকনো নদীর প্রেক্ষাগৃহ

​শাহজাহান সরকার

​আজ বুধবার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার, পবিত্র ঈদুল আযহা। চারদিকে একটা উৎসবের মৃদু গুঞ্জন, মসলার ঝাঁঝালো গন্ধ আর কোরবানির পশুর ডাক। কিন্তু এই কোলাহল আব্দুল হাকিম সাহেবের জীর্ণ দেয়ালের ঘরে এসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় রূপ নেয়।

​আব্দুল হাকিম সাহেব একজন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ। সমাজে তাঁর একটা সুনাম আছে, সবাই তাঁকে একনামে চেনে। কিন্তু ভেতরের ফাঁপা কঙ্কালটা কেবল তিনিই চেনেন। এবার তিনি সন্তান, নাতি-পুতিদের জন্য একটা কোরবানির ব্যবস্থা করতে পারেন নাই। কোরবানি তো দূরের কথা, বাজার থেকে ৫-১০ কেজি মাংস কিনে এনে যে সবাইকে একটু তৃপ্তি করে খাওয়াবেন, সেই আর্থিক সামর্থ্যও অবশিষ্ট নেই। অথচ বাইরে তিনি এমন এক মুখোশ পরে ঘোরেন, যাতে কেউ বুঝতেই না পারে তাঁর এই চরম অভাবের কথা। কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে তাঁর মরে যাওয়া সহজ। ভিক্ষা করা কিংবা মিসকিনের মতো কারো দ্বারে গিয়ে দাঁড়ানো—তাঁর রক্তে নেই।

বাজারে শেষ মুহূর্তের কোলাহল। গরুর হাটের ধুলোমাখা মানুষগুলো বাড়ি ফিরছে। কারো হাতে রশি, কারো হাতে বাজারের ব্যাগ, কারো মুখে তৃপ্তির হাসি।

শুধু আব্দুল হাকিমের ঘরে কোনো শব্দ নেই।
একটা পুরোনো টেবিল ফ্যান কাঁপতে কাঁপতে ঘুরছে। মাঝেমধ্যে কটকট শব্দ করছে। হাকিম মিয়া মেঝেতে বসে আছেন। সামনে আধা কেজি ডাল, কিছু আলু, আর ছোট্ট একটা তেলের বোতল। পাঁচ হাজার টাকা শেষ।

টাকাটা বড় নাতনির বাবা পাঠিয়েছিল প্রাইভেট মাস্টারের বেতন দেওয়ার জন্য। বিকাশে টাকা আসার সময় জামাই বলেছি—

—“আব্বা, টাকাটা কালকের মধ্যে দিয়ে দিয়েন। মেয়েটার স্যার বারবার তাগাদা দিচ্ছে।”

হাকিম মিয়া তখন শুধু বলেছিলেন—
—আচ্ছা বাবা।

তারপর?
তারপর বাজার।
চাল নেই।
ডাল নেই।
ছোট নাতিটা দুইদিন ধরে ডিম খেতে চায়।
বড় মেয়ে ফোন করে বলেছে, “আব্বা, ঈদে একটু মাংসের ব্যবস্থা কইরেন।”

কোথা থেকে করবে?

তিনি বাজারে গিয়েছিলেন শুধু এক কেজি চাল কিনতে। কিন্তু বাজারে ঢুকেই বুঝলেন—এক কেজি চালে ঈদ হয় না। তারপর একটার পর একটা জিনিস কিনতে কিনতে পাঁচ হাজার টাকা শেষ হয়ে গেল।

এখন বুকের ভেতর শুধু আগুন।

তিনি জীবনে কারো কাছে হাত পাতেননি।
এলাকায় সম্মান আছে।

মানুষ তাকে “হাকিম ভাই” বলে ডাকে।
মসজিদে গেলে সামনে বসায়।
কেউ জানে না—ঈদের আগের রাতে তার ঘরে কোরবানির এক টুকরো মাংসও নেই।
তিনি কাউকে বুঝতেও দেন না।

কারণ অভাব লুকানোও এক ধরনের ইবাদত—এ কথা তিনি ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছেন।

কিন্তু আজ বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে।
তিনি বারবার ভাবছেন—
“বাবা হয়ে সন্তানদের ঈদে এক টুকরো মাংস দিতে পারলাম না!”

রাত তখন ১১টা।
ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু তিনি জেগে আছেন। বাইরে দূরে কোথাও মাইকে বাজছে—
“তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে…”
গানটা শুনতে শুনতে কখন যেন তার চোখ লেগে গেল।

তিনি দেখলেন—
তিনি আর তার এক পুরোনো বন্ধু সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন।
কোন সিনেমা?
মনে করতে পারছেন না।
শুধু মনে হচ্ছে, জীবনে দ্বিতীয়বার এই ছবি দেখতে এসেছেন। যেন আগে কোথাও দেখেছেন। যেন এই গল্প আগেও ঘটেছে।
রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন দু’জনে।

হঠাৎ তার বন্ধু আরেক বন্ধুকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল।
—“তুই আগে যা, দুইটা টিকিট কাইটা রাখ।”
হাকিম মিয়া মাথা নেড়ে সামনে এগোলেন।
অদ্ভুত একটা রাস্তা।
রাস্তার নিচে নদী। কিন্তু নদীতে পানি নেই। শুকনো। ফেটে যাওয়া মাটি। যেন বহুদিন কোনো স্রোত আসে না এখানে। তিনি নদীর মাঝখান দিয়ে হাঁটছেন।

চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ নদী থেকে ওপরে উঠতেই দেখলেন সামনে একটা কবরস্থান।

সারি সারি কবর।
বাতাস ঠান্ডা।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
তিনি ভাবলেন—
সিনেমা হলের সামনে কবরস্থান কেন?
তারপরও হাঁটলেন।

কারণ টিকিট কাটতেই হবে।
সিনেমা শুরু হয়ে যাবে।
টিকিট মাস্টারকে প্রথমে যেখানে দেখেছিলেন, সেখানে নেই। অন্য জায়গায় গিয়ে বসেছে।

তিনি গিয়ে বললেন—
—“দুইটা প্রথম শ্রেণীর টিকিট দেন।”
লোকটা তার দিকে তাকালও না।
অন্য লোকের সঙ্গে ব্যস্ত।
তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার মনে হলো—এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের কথার কোনো দাম নেই।
তিনি বিরক্ত হয়ে আরেকজন পরিচিত বাক্সওয়ালার কাছে গেলেন। গিয়ে দেখেন—লোকটা নেই। টিকিট বিক্রি বন্ধ করে চলে গেছে।

চারপাশে অদ্ভুত ভিড়।
অনেক মানুষ।
কিন্তু সবাই কেমন ফাঁপা।
খালি খালি।
যেন কারো ভেতরে প্রাণ নেই।

তিনি আবার প্রথম লোকটার কাছে ফিরে এলেন।
পকেট থেকে ২০ টাকার দুইটা নোট বের করলেন।
লোকটা এবার টাকা নিল।
দুইটা টিকিট দিল।
টিকিট হাতে নিয়ে হাকিম মিয়ার বুক ধক করে উঠল।
যদি বন্ধুকে আর না পান?
যদি ভিতরে ঢুকে আলাদা হয়ে যান?
যদি রাতে ফেরার সময় দেখা না হয়?
চারদিকে তখন সিনেমা হলের ভেতর থেকে শব্দ আসছে।
মনে হচ্ছে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে।
তিনি ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবেন—
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল।
রাত ১টা ২০।
হাকিম মিয়া উঠে বসে রইলেন।
ঘামছে শরীর।
চারপাশ অন্ধকার।
তিনি কিছুক্ষণ বুঝতেই পারলেন না—কোনটা স্বপ্ন, কোনটা বাস্তব।
তারপর ধীরে ধীরে মনে পড়ল—
ঈদ।
মাংস নেই।
টাকা নেই।
প্রাইভেট মাস্টারের বেতন নেই।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ছোট নাতিটার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“নানা…”
তিনি চমকে উঠলেন।
—“কি বাবা?”
—“কাল কি ঈদ?”
—“হ।”
—“আমরা মাংস খামু?”
প্রশ্নটা শুনে তার বুকের ভেতর কেউ যেন ছুরি চালিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন,
—“আল্লাহ বড় রহমতের মালিক বাবা…”
নাতিটা আবার ঘুমিয়ে গেল।
কিন্তু হাকিম মিয়া আর ঘুমাতে পারলেন না।
ফজরের আজান পর্যন্ত তিনি চুপচাপ বসে রইলেন।
তারপর অজু করলেন।
নামাজ শেষে দুই হাত তুলে শুধু একটা কথাই বললেন—
—“হে আল্লাহ, মানুষরে না পারি বলতে… তোমারে তো পারি…”