০৫:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লাভের আশায় হিমাগারে আলু, লোকসানের শঙ্কায় কালাইয়ের কৃষক-ব্যবসায়ী

  • প্রকাশের সময় : ০৭:০৬:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
  • 40

ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ

জাহিদুল ইসলাম (জাহিদ), স্টাফ রিপোর্টার:
১৮ আগস্ট ২০২৬

এক বছর আগের লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে আবারও আলু চাষে বিনিয়োগ করেছিলেন জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষকরা। কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন, কেউ স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখেছেন। আবার কেউ জমানো টাকা খরচ কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আলু চাষে নামেন। প্রত্যাশা ছিল, মৌসুম শেষে ভালো দাম মিলবে, আগের বছরের দেনা শোধ হবে এবং সংসারে ফিরবে স্বস্তি। কিন্তু সেই প্রত্যাশায় আবারও ভাটা পড়েছে।

উৎপাদন, বাছাই, বস্তা, কেয়ারিং, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় বর্তমানে আলু বিক্রি করে লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলু এখন কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে না পারায় বাড়তি সংরক্ষণ ব্যয়ও কৃষকের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কালাইয়ের বাজারে ৬০ কেজির এক বস্তা এস্টোরিক আলু বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকায়। অথচ উৎপাদন থেকে শুরু করে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব খরচ হিসাব করলে একই বস্তা আলুর পেছনে কৃষকের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সে হিসাবে বর্তমান বাজারদরে প্রতি বস্তায় প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে দাবি কৃষকদের।

কৃষকদের হিসাবে, এক শতক জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। ওই পরিমাণ জমিতে গড়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন মণ আলু। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ আলুর দাম ছিল প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তখন কেউ কেউ উৎপাদন পর্যায়ে সামান্য লাভের আশা করলেও অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচই পুরোপুরি ওঠেনি। পরে দাম বাড়ার আশায় অনেকে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু হিমাগার ভাড়া, বস্তা, কেয়ারিং ও পরিবহনসহ বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় প্রত্যাশিত দাম না বাড়ায় লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আলু চাষে লোকসানের পরও তাঁরা চাষ থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় চলতি মৌসুমে আরও বেশি ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। কারও বিনিয়োগের উৎস ছিল গবাদিপশু বিক্রির টাকা, কারও স্ত্রীর বন্ধক রাখা গহনা, আবার কেউ ধারদেনা ও এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করেছেন।
তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, আলুর ভালো দাম পেলে প্রথমে ঋণ পরিশোধ করবেন, এরপর সংসারের প্রয়োজন মেটাবেন এবং বন্ধক রাখা গহনা ছাড়াবেন। কিন্তু বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই হিসাব অনেকটাই উল্টে গেছে। আগের বছরের লোকসান পুষিয়ে ওঠা তো দূরের কথা, চলতি মৌসুমেও বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

কালাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১৪টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মোট ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৪২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। মৌসুমের শুরুতে এসব হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৭ মেট্রিক টন আলু। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত গত চার মাসে হিমাগারগুলো থেকে বের হয়েছে ২৮ হাজার ৪০ মেট্রিক টন আলু। বর্তমানে হিমাগারগুলোতে মজুত রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১৭ মেট্রিক টন আলু।

বিপুল পরিমাণ আলু এখনও হিমাগারে মজুত থাকায় বাজারে একসঙ্গে সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত মৌসুমে কালাই উপজেলায় মোট ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল। স্থানীয় হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৭৯৬ বিঘা।

কালাই উপজেলার জমিনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাকিম ৬০০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। তাঁর দাবি, হিমাগার ভাড়াসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী ওই আলু বিক্রি করে পাওয়া যেতে পারে প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। সে হিসাবে চার মাস হিমাগারে সংরক্ষণ করার পরও তাঁর প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আব্দুল হাকিম বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে দাম কম থাকায় ভালো দামের আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। কিন্তু দাম আর বাড়েনি। এখন বিক্রি করলে বড় লোকসান, আবার হিমাগারে রাখলেও বাড়ছে খরচ। কী করব বুঝতে পারছি না।’

কালাই উপজেলার মান্নান এন্ড সন্স হিমাগারে আলু ব্যবসায়ী রুবেল, রায়হান ও আলীসহ কয়েকজন জানান, বাজারে আলুর দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি বস্তায় প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে বলে জানান তাঁরা। বর্তমানে ৬০ কেজির এক বস্তা আলু ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে কৃষকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও লোকসানের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু একসঙ্গে বাজারে এলে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম আরও কমতে পারে। তাঁদের প্রশ্ন, আলুর বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি সামনে আরও দরপতন হবে।

কালাইয়ের আলু রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সূচি এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সুজাউল ইসলাম জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রায় নয় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করছে। তবে চলতি মৌসুমে বিদেশি বাজারে চাহিদা কম থাকায় প্রত্যাশিত মাত্রায় আলু রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, দেশে আলুর অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ কমাতে নতুন বিদেশি বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে কৃষক ন্যায্য দাম পাওয়ার পাশাপাশি দেশের বাজারেও অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে।

কালাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ হারুনুর রশিদ বলেন, বর্তমানে আলুর বাজারদর কিছুটা কম। হিমাগারে মজুতের পরিমাণ বেশি থাকায় সরবরাহের চাপও রয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। রপ্তানি ও বিকল্প বাজার বাড়ানো গেলে কৃষক ভালো দাম পেতে পারেন। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানো ও কার্যকর বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষকের লোকসানের এই চিত্র শুধু আলুর দাম কমে যাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উৎপাদন ব্যয়, হিমাগার ভাড়া, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং বিপণন ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। কৃষক যে দামে আলু বিক্রি করেন, ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সেই আলুর দাম বেড়ে যায়। অথচ বাড়তি দামের পুরো সুফল উৎপাদক কৃষক পান না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ অবস্থায় উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সংরক্ষণ ব্যয় কমানো, সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো, কৃষকদের সঠিক বাজার তথ্য দেওয়া এবং আলু রপ্তানির নতুন বাজার তৈরির দাবি উঠেছে।

কালাইয়ের কৃষকদের কাছে আলু শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়; এটি তাঁদের বিনিয়োগ, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম অবলম্বন। এক মৌসুমের লোকসান সামলে যাঁরা আবারও ঋণ করে মাঠে নামেন, তাঁদের জন্য বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একের পর এক লোকসানের পরও পরবর্তী মৌসুমে কৃষককে চাষে টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা কোথায়—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কালাইয়ের আলুচাষিদের মধ্যে।

জনপ্রিয়

ক্ষেতলালে প্রেমিকের বাড়িতে এক সন্তানের জননীর অবস্থান ৷৷ বিয়ের দাবিতে আত্মহত্যার হুমকি

লাভের আশায় হিমাগারে আলু, লোকসানের শঙ্কায় কালাইয়ের কৃষক-ব্যবসায়ী

প্রকাশের সময় : ০৭:০৬:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ

জাহিদুল ইসলাম (জাহিদ), স্টাফ রিপোর্টার:
১৮ আগস্ট ২০২৬

এক বছর আগের লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে আবারও আলু চাষে বিনিয়োগ করেছিলেন জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষকরা। কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন, কেউ স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখেছেন। আবার কেউ জমানো টাকা খরচ কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আলু চাষে নামেন। প্রত্যাশা ছিল, মৌসুম শেষে ভালো দাম মিলবে, আগের বছরের দেনা শোধ হবে এবং সংসারে ফিরবে স্বস্তি। কিন্তু সেই প্রত্যাশায় আবারও ভাটা পড়েছে।

উৎপাদন, বাছাই, বস্তা, কেয়ারিং, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় বর্তমানে আলু বিক্রি করে লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলু এখন কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে না পারায় বাড়তি সংরক্ষণ ব্যয়ও কৃষকের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কালাইয়ের বাজারে ৬০ কেজির এক বস্তা এস্টোরিক আলু বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকায়। অথচ উৎপাদন থেকে শুরু করে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব খরচ হিসাব করলে একই বস্তা আলুর পেছনে কৃষকের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সে হিসাবে বর্তমান বাজারদরে প্রতি বস্তায় প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে দাবি কৃষকদের।

কৃষকদের হিসাবে, এক শতক জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। ওই পরিমাণ জমিতে গড়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন মণ আলু। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ আলুর দাম ছিল প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তখন কেউ কেউ উৎপাদন পর্যায়ে সামান্য লাভের আশা করলেও অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচই পুরোপুরি ওঠেনি। পরে দাম বাড়ার আশায় অনেকে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু হিমাগার ভাড়া, বস্তা, কেয়ারিং ও পরিবহনসহ বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় প্রত্যাশিত দাম না বাড়ায় লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আলু চাষে লোকসানের পরও তাঁরা চাষ থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় চলতি মৌসুমে আরও বেশি ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। কারও বিনিয়োগের উৎস ছিল গবাদিপশু বিক্রির টাকা, কারও স্ত্রীর বন্ধক রাখা গহনা, আবার কেউ ধারদেনা ও এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করেছেন।
তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, আলুর ভালো দাম পেলে প্রথমে ঋণ পরিশোধ করবেন, এরপর সংসারের প্রয়োজন মেটাবেন এবং বন্ধক রাখা গহনা ছাড়াবেন। কিন্তু বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই হিসাব অনেকটাই উল্টে গেছে। আগের বছরের লোকসান পুষিয়ে ওঠা তো দূরের কথা, চলতি মৌসুমেও বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

কালাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১৪টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মোট ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৪২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। মৌসুমের শুরুতে এসব হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৭ মেট্রিক টন আলু। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত গত চার মাসে হিমাগারগুলো থেকে বের হয়েছে ২৮ হাজার ৪০ মেট্রিক টন আলু। বর্তমানে হিমাগারগুলোতে মজুত রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১৭ মেট্রিক টন আলু।

বিপুল পরিমাণ আলু এখনও হিমাগারে মজুত থাকায় বাজারে একসঙ্গে সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত মৌসুমে কালাই উপজেলায় মোট ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল। স্থানীয় হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৭৯৬ বিঘা।

কালাই উপজেলার জমিনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাকিম ৬০০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। তাঁর দাবি, হিমাগার ভাড়াসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী ওই আলু বিক্রি করে পাওয়া যেতে পারে প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। সে হিসাবে চার মাস হিমাগারে সংরক্ষণ করার পরও তাঁর প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আব্দুল হাকিম বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে দাম কম থাকায় ভালো দামের আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। কিন্তু দাম আর বাড়েনি। এখন বিক্রি করলে বড় লোকসান, আবার হিমাগারে রাখলেও বাড়ছে খরচ। কী করব বুঝতে পারছি না।’

কালাই উপজেলার মান্নান এন্ড সন্স হিমাগারে আলু ব্যবসায়ী রুবেল, রায়হান ও আলীসহ কয়েকজন জানান, বাজারে আলুর দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি বস্তায় প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে বলে জানান তাঁরা। বর্তমানে ৬০ কেজির এক বস্তা আলু ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে কৃষকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও লোকসানের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু একসঙ্গে বাজারে এলে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম আরও কমতে পারে। তাঁদের প্রশ্ন, আলুর বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি সামনে আরও দরপতন হবে।

কালাইয়ের আলু রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সূচি এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সুজাউল ইসলাম জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রায় নয় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করছে। তবে চলতি মৌসুমে বিদেশি বাজারে চাহিদা কম থাকায় প্রত্যাশিত মাত্রায় আলু রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, দেশে আলুর অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ কমাতে নতুন বিদেশি বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে কৃষক ন্যায্য দাম পাওয়ার পাশাপাশি দেশের বাজারেও অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে।

কালাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ হারুনুর রশিদ বলেন, বর্তমানে আলুর বাজারদর কিছুটা কম। হিমাগারে মজুতের পরিমাণ বেশি থাকায় সরবরাহের চাপও রয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। রপ্তানি ও বিকল্প বাজার বাড়ানো গেলে কৃষক ভালো দাম পেতে পারেন। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানো ও কার্যকর বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষকের লোকসানের এই চিত্র শুধু আলুর দাম কমে যাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উৎপাদন ব্যয়, হিমাগার ভাড়া, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং বিপণন ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। কৃষক যে দামে আলু বিক্রি করেন, ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সেই আলুর দাম বেড়ে যায়। অথচ বাড়তি দামের পুরো সুফল উৎপাদক কৃষক পান না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ অবস্থায় উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সংরক্ষণ ব্যয় কমানো, সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো, কৃষকদের সঠিক বাজার তথ্য দেওয়া এবং আলু রপ্তানির নতুন বাজার তৈরির দাবি উঠেছে।

কালাইয়ের কৃষকদের কাছে আলু শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়; এটি তাঁদের বিনিয়োগ, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম অবলম্বন। এক মৌসুমের লোকসান সামলে যাঁরা আবারও ঋণ করে মাঠে নামেন, তাঁদের জন্য বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একের পর এক লোকসানের পরও পরবর্তী মৌসুমে কৃষককে চাষে টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা কোথায়—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কালাইয়ের আলুচাষিদের মধ্যে।