০৩:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রতিবন্ধী নারীর ভাতা আত্মসাৎ করলেন মহিলা মেম্বার ও তার স্বামী 

  • প্রকাশের সময় : ০৯:১৮:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
  • 86

ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ

নওগাঁ প্রতিনিধি : ২৭ নভেম্বর ২০২৫

নওগাঁর বদলগাছীতে প্রায় আড়াই বছর ধরে এক অসহায় প্রতিবন্ধী নারীর ভাতার টাকা স্বামী প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন এলাকার সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য তাহমিনা আক্তার। মানবিক সমাজে অমানবিকতার এমন নির্মম দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।

টাকা আত্মসাৎ এর বিষয়টি জানাজানির পর বদলগাছীর পাহাড়পুরে গ্রাম-মহল্লা থেকে চায়ের দোকান সবখানেই চলছে ক্ষোভের ঝড়।

তাহমিনা বেগম বদলগাছী উপজেলার ৩নং পাহাড়পুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য এবং স্বামী মিজানুর রহমান, উপজেলার শেরপুর দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের পাঁচঘরিয়া গ্রামের নজরুলের প্রতিবন্ধী স্ত্রী মোসা. মুক্তা (৪০) প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য স্থানীয় মহিলা সদস্য তহমিনার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। মহিলা সদস্য তহমিনা ২০২৩ সালের ১ জুলাই তার নামে ভাতার কার্ড করে দেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে ভাতাভোগীর মোবাইল নম্বর না দিয়ে তহমিনার স্বামী মিজানুর রহমানের নম্বর বসিয়ে দেন। এরপর থেকেই নিয়মিত ভাতা তুলছেন ওই প্রধান শিক্ষক।

ভাতা যে আসছে সে বিষয়টি ভাতাভোগী মুক্তাকে  জানানো হয়নি,টাকাও দেওয়া হয়নি। প্রায় আড়াই বছর ধরে মহিলা ইউপি সদস্য তাহমিনার মাধ্যমে প্রতিমাসেই টাকা তুলেছেন তিনি, অথচ প্রকৃত ভাতাভোগী রয়েছেন অন্ধকারে।

হয়তো আরও কয়েক বছর এভাবেই চলত। কিন্তু চলতি নভেম্বরের মাঝামাঝি নতুন ভাতার আবেদন নিতে সমাজসেবা অফিস থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর মুক্তা অফিসে গিয়ে জানতে পারেন, তার নামে আড়াই বছর ধরে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এ কথা শুনে মুক্তা হতবাক হয়ে যান। পরে এলাকাজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।

মুক্তা বলেন “প্রায় তিন বছর আগে মেম্বার তহমিনা আমার কাগজপত্র নিয়েছিলো। বারবার জিজ্ঞেস করলে বলতো হয়ে যাবে। কিন্তু আমি কোনো টাকা পাইনি। সমাজসেবা অফিসে কয়েকদিন আগে গিয়ে শুনলাম, আমার নামে ভাতা তো হয়েছে অনেক আগে, মোবাইল নম্বরও আমার না মেম্বারের স্বামীর।”

তিনি আরও জানান,“এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মহিলা মেম্বারের স্বামি মিজানুর মাস্টার আমাকে ১০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছে। কয়েকদিন পর পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর মাস্টার ও মাসুদ মেম্বার আমার বাড়ি এসে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু আড়াই বছরের টাকা তো প্রায় ৩০ হাজার টাকা হয়। আমার প্রতিবন্ধী ভাতার বাকী টাকা দিলো না কেন?

ভুক্তভোগীর স্বামী নজরুল বলেন, অফিস থেকে নতুন করে আবেদনের মাইকিং করলে, আমরা আবেদন করতে গিয়ে জানতে পারি আমার আবেদন আগেই হয়েছে এবং একাউন্টে টাকাও ঢুকেছে। নাম্বার টা কার জানতে চাইলে নাম্বার নিয়ে  জয়পুরহাট কাস্টমার কেয়ারে যেতে বলে। আমি সেখানে গেলে নাম্বারটির নাম মিজানুর রহমান মাষ্টার ভেসে উঠে। আমি তার কাছে গেলে সে মিথ্যা কথা বলে,যে আমি ওটা দেইনি আমি জানিনা,আমার বউ কি করছে না করছে জানিনা।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আফসার আলী ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “এক প্রতিবন্ধী নারীর ভাতার টাকা আত্মসাৎ কোনো সাধারণ অন্যায় নয়। এটি তার বেঁচে থাকার আশাকে চুরি করা।”

আরেক বাসিন্দা নুরুল হোসেন বলেন,“যে শিক্ষক তার ছাত্রদের মানুষের মতো মানুষ তৈরি করবেন, তিনিই যদি এমন করেন তাহলে সমাজ কোথায় যাবে।মানবিক সমাজে অমানবিকতার এমন নির্মম দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতি মিজানুর রহমানকে মুঠোফোনে পাওয়া গেলেও তিনি শুধু বলেন“মুঠোফোনে কিছু বলা যাবে না, সাক্ষাতে কথা বলবো। তারপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

অপরদিকে মহিলা সদস্য তহমিনা দাবি করেন,“ভুল করে এমনটি হয়েছে। এখন সংশোধন হয়েছে। তাছাড়া আমার স্বামীর সাথে  মুক্তার বিষয়টি মিমাংসা করেছে।”

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার বলেন,“এটি স্পষ্ট অনিয়ম। আমরা মোবাইল নম্বর সংশোধন করেছি। আবেদনকারীকে নিজের নগদ নম্বর ব্যবহারের পরামর্শ সবসময় দেই।”

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি জানান,“এ বিষয়ে এখনো লিখিতভাবে কোন অভিযোগ পাই নি। আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। যদি সত্য হয় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এলাকাবাসী মনে করছেন একজন শিক্ষক তিন বছর ধরে ভাতা তুলে থাকলে, এমন ঘটনা আরও থাকতে পারে। তদন্ত শুরু হলে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা।

জনপ্রিয়

সাপাহারে নার্স-মিডওয়াইফদের প্রতীকি শাটডাউন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

প্রতিবন্ধী নারীর ভাতা আত্মসাৎ করলেন মহিলা মেম্বার ও তার স্বামী 

প্রকাশের সময় : ০৯:১৮:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ

নওগাঁ প্রতিনিধি : ২৭ নভেম্বর ২০২৫

নওগাঁর বদলগাছীতে প্রায় আড়াই বছর ধরে এক অসহায় প্রতিবন্ধী নারীর ভাতার টাকা স্বামী প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন এলাকার সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য তাহমিনা আক্তার। মানবিক সমাজে অমানবিকতার এমন নির্মম দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।

টাকা আত্মসাৎ এর বিষয়টি জানাজানির পর বদলগাছীর পাহাড়পুরে গ্রাম-মহল্লা থেকে চায়ের দোকান সবখানেই চলছে ক্ষোভের ঝড়।

তাহমিনা বেগম বদলগাছী উপজেলার ৩নং পাহাড়পুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য এবং স্বামী মিজানুর রহমান, উপজেলার শেরপুর দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের পাঁচঘরিয়া গ্রামের নজরুলের প্রতিবন্ধী স্ত্রী মোসা. মুক্তা (৪০) প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য স্থানীয় মহিলা সদস্য তহমিনার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। মহিলা সদস্য তহমিনা ২০২৩ সালের ১ জুলাই তার নামে ভাতার কার্ড করে দেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে ভাতাভোগীর মোবাইল নম্বর না দিয়ে তহমিনার স্বামী মিজানুর রহমানের নম্বর বসিয়ে দেন। এরপর থেকেই নিয়মিত ভাতা তুলছেন ওই প্রধান শিক্ষক।

ভাতা যে আসছে সে বিষয়টি ভাতাভোগী মুক্তাকে  জানানো হয়নি,টাকাও দেওয়া হয়নি। প্রায় আড়াই বছর ধরে মহিলা ইউপি সদস্য তাহমিনার মাধ্যমে প্রতিমাসেই টাকা তুলেছেন তিনি, অথচ প্রকৃত ভাতাভোগী রয়েছেন অন্ধকারে।

হয়তো আরও কয়েক বছর এভাবেই চলত। কিন্তু চলতি নভেম্বরের মাঝামাঝি নতুন ভাতার আবেদন নিতে সমাজসেবা অফিস থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর মুক্তা অফিসে গিয়ে জানতে পারেন, তার নামে আড়াই বছর ধরে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এ কথা শুনে মুক্তা হতবাক হয়ে যান। পরে এলাকাজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।

মুক্তা বলেন “প্রায় তিন বছর আগে মেম্বার তহমিনা আমার কাগজপত্র নিয়েছিলো। বারবার জিজ্ঞেস করলে বলতো হয়ে যাবে। কিন্তু আমি কোনো টাকা পাইনি। সমাজসেবা অফিসে কয়েকদিন আগে গিয়ে শুনলাম, আমার নামে ভাতা তো হয়েছে অনেক আগে, মোবাইল নম্বরও আমার না মেম্বারের স্বামীর।”

তিনি আরও জানান,“এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মহিলা মেম্বারের স্বামি মিজানুর মাস্টার আমাকে ১০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছে। কয়েকদিন পর পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর মাস্টার ও মাসুদ মেম্বার আমার বাড়ি এসে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু আড়াই বছরের টাকা তো প্রায় ৩০ হাজার টাকা হয়। আমার প্রতিবন্ধী ভাতার বাকী টাকা দিলো না কেন?

ভুক্তভোগীর স্বামী নজরুল বলেন, অফিস থেকে নতুন করে আবেদনের মাইকিং করলে, আমরা আবেদন করতে গিয়ে জানতে পারি আমার আবেদন আগেই হয়েছে এবং একাউন্টে টাকাও ঢুকেছে। নাম্বার টা কার জানতে চাইলে নাম্বার নিয়ে  জয়পুরহাট কাস্টমার কেয়ারে যেতে বলে। আমি সেখানে গেলে নাম্বারটির নাম মিজানুর রহমান মাষ্টার ভেসে উঠে। আমি তার কাছে গেলে সে মিথ্যা কথা বলে,যে আমি ওটা দেইনি আমি জানিনা,আমার বউ কি করছে না করছে জানিনা।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আফসার আলী ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “এক প্রতিবন্ধী নারীর ভাতার টাকা আত্মসাৎ কোনো সাধারণ অন্যায় নয়। এটি তার বেঁচে থাকার আশাকে চুরি করা।”

আরেক বাসিন্দা নুরুল হোসেন বলেন,“যে শিক্ষক তার ছাত্রদের মানুষের মতো মানুষ তৈরি করবেন, তিনিই যদি এমন করেন তাহলে সমাজ কোথায় যাবে।মানবিক সমাজে অমানবিকতার এমন নির্মম দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতি মিজানুর রহমানকে মুঠোফোনে পাওয়া গেলেও তিনি শুধু বলেন“মুঠোফোনে কিছু বলা যাবে না, সাক্ষাতে কথা বলবো। তারপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

অপরদিকে মহিলা সদস্য তহমিনা দাবি করেন,“ভুল করে এমনটি হয়েছে। এখন সংশোধন হয়েছে। তাছাড়া আমার স্বামীর সাথে  মুক্তার বিষয়টি মিমাংসা করেছে।”

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার বলেন,“এটি স্পষ্ট অনিয়ম। আমরা মোবাইল নম্বর সংশোধন করেছি। আবেদনকারীকে নিজের নগদ নম্বর ব্যবহারের পরামর্শ সবসময় দেই।”

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি জানান,“এ বিষয়ে এখনো লিখিতভাবে কোন অভিযোগ পাই নি। আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। যদি সত্য হয় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এলাকাবাসী মনে করছেন একজন শিক্ষক তিন বছর ধরে ভাতা তুলে থাকলে, এমন ঘটনা আরও থাকতে পারে। তদন্ত শুরু হলে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা।