
ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
মোঃ সাকিব ইসলাম, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট): ১ জুন ২০২৬
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় প্রচলিত ধান ও সবজি চাষের ধারা ভেঙে ব্যতিক্রমী উদ্যোগে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তরুণ কৃষক আবু হুরাইরা। বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে তিনি ইতোমধ্যেই লাখ টাকার স্বপ্ন ছুঁয়েছেন। মাত্র ২৫ শতক জমিতে শুরু করা তার এই যাত্রা আজ এলাকার কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তার সাফল্যের গল্প এখন শুধু পাঁচবিবি নয়, গোটা জয়পুরহাটের তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিতে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
চাকরির পেছনে নয়, কৃষিতেই ভবিষ্যৎঃ
পড়াশোনা শেষ করার পর অনেক তরুণের মতো আবু হুরাইরাও চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের জমি আর শ্রমই হতে পারে সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই ভাবনা থেকেই তিনি কৃষিতে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবার-পরিজনের নানা প্রশ্ন ও সংশয়কে পাশ কাটিয়ে তিনি বেছে নেন আঙুর চাষের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় ফসল।
২০২৪ সালের শুর দিকে নিজ বাড়ির ২৫ শতক পতিত জমি পরিষ্কার করে তিনি প্রথমে ৬৫টি উন্নত জাতের আঙুরের চারা রোপণ করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পরামর্শ, ইউটিউবের টিউটোরিয়াল এবং নিজের অদম্য পরিশ্রমকে পুঁজি করে তিনি পরিচর্যা শুরু করেন। প্রথম বছরেই প্রতিটি গাছে থোকা থোকা ফুল ও ফলের দেখা মেলে। বর্তমানে তার বাগানের গাছগুলোতে ঝুলছে রসালো সবুজ আঙুরের থোকা, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দূর-দূরান্তের কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা।
লাখ টাকার মুখ দেখা ও নতুন সম্ভাবনাঃ
আবু হুরাইরা জানান, প্রথম বছরেই ফল বিক্রি করে তার উৎপাদন খরচ উঠে এসেছে। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকার আঙুর বিক্রির আশা করছেন। পাশাপাশি তিনি বাগান থেকেই বিভিন্ন জাতের আঙুরের চারা উৎপাদন করে বিক্রি করছেন। প্রতি পিস চারা ৮০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় এটি তার জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, “আমরা সারাজীবন ধান-গম করেই আসছি। এই এলাকায় কেউ আঙুর চাষের কথা ভাবতেও পারেনি। আবু হুরাইরা করে দেখিয়েছে। এখন আমরাও দুই-একজন মিলে অল্প করে চেষ্টা করছি।”
এলাকায় আলোড়ন, তরুণদের ভিড়ঃ
আবু হুরাইরার বাগান এখন পাঁচবিবির একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষক, শিক্ষার্থী, কৃষি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ বাগান পরিদর্শনে আসছেন। অনেকে সেলফি তুলছেন, অনেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তার এই সাফল্য এলাকার বেকার তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
আবু হুরাইরা বলেন, “মানুষজন বলে কৃষিতে লাভ নেই। আমি বলি, পরিকল্পনা আর পরিশ্রম থাকলে কৃষিই সবচেয়ে লাভজনক। আমি চাই আমার দেখাদেখি আরও তরুণরা এগিয়ে আসুক। সরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা এই এলাকাকে আঙুরের ‘হাব’ বানাতে পারি।”
কৃষি বিভাগের ভূয়সী প্রশংসাঃ
পাঁচবিবি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, আবু হুরাইরার উদ্যোগ উপজেলা কৃষি বিভাগকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। মাটি ও আবহাওয়া বিবেচনায় জয়পুরহাটে আঙুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং সামনে আরও কৃষককে এই ফসল চাষে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ধান-গমের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফল চাষে কৃষকরা ঝুঁকলে দেশের কৃষি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে। আবু হুরাইরার মতো তরুণ উদ্যোক্তারা সেই পথই দেখাচ্ছেন।
আবু হুরাইরার সাফল্য প্রমাণ করে—ইচ্ছা, সাহস আর পরিশ্রম থাকলে ডিগ্রি হাতে বসে না থেকে মাটিতেই সোনা ফলানো সম্ভব। তার এই গল্প নিঃসন্দেহে হাজারো বেকার তরুণের জন্য একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।


















